৭১ এর পতিশ্রুতি - হাতেখড়ি

৭১ এর পতিশ্রুতি

মোঃ হাসান মাহমুদ বজ্র:

জনবহুল এলাকা। মোড় থেকে চার দিকে চারটি রাস্তা চলে গেছে। ধানের জমি ভরাট করে করা হয়েছে বেশ কয়েকটি স্কুল। ও দিকে করা হয়েছে ইটের বাড়ি, এই ফসলের জমিতেই গড়ে উঠেছে এক অভিজাত্য গ্রাম। দিনে দিনে এই গ্রাম ব্যাপক বিস্তার লাভ করছে সাথে তাল মিলিয়ে কমছে ফসলি জমি। এ গাঁয়ের মানুষের ভাগ্য বদলেছে। আগে এই গ্রামের মানুষ জমি চাষ করেই চলতো। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতো। তখন দিগন্ত চোঁয়া ছিলো ফসলের মাঠে সারা দিন পরিশ্রম করে বৎসর শেষে যা উৎপাদন করে পেত তা দিয়েই সারা বৎসর চলতে হতো। এখন আর সে দিন নেই। দিন বদলে গেছে।  মানুষ এখন সচ্ছল। যদিও  ক্রমাগত কমছে ফসলের জমি। এখন এ গাঁয়ের কেউ তেমন একটা চাষ করে না। কেউ থাকে বিদেশ কেউ বা শহরে ব্যবসা বানিজ্য করে কেউ গাঁয়ের বাজারেই বড় বড় ব্যবসা খুলে বসেছে। আগে এই গাঁয়ের বাজারে চায়ের দোকান, মুদি দোকান, কামার কুমারের দোকান আর সাপ্তাহে দুদিন কাঁচা তরকারী ছাড়া কিছুই ছিলো না।  এখন সেখানে গড়ে উঠেছে বড় বড় জুয়েলারি, ইলেকটনিক্স, টাইলস, শোরুম, দামী রেস্তোরা, কনফেকশনারি, বিলাসিত সেলুন, পার্লার, কফি হাউস ইত্যাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই গাঁয়ের মানুষের আগের সেই খড়ের কুঁড়ে ঘর এখন আর নেই। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে বড় বড় ইটের বাড়ি। সেই বাড়ি সাজানো হয়েছে দেশি বিদেশি নামী দামী টাইলস ও সিরামিক্স বসিয়ে। আগে এ গাঁয়ে মেট্টিক পাশ করা কেউ ছিলো না, আর এখন ঘরে ঘরে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিরিস্টার, উকিল, মেজিস্টেট, প্রফেসর ও লেকচারারের ছড়াছড়ি। এখন সেই অজপাড়া গাঁ পরিনত হয়েছে অভিজাত্য একটি মহল্লায়। সব বদলে গেছে, সবাই বদলে গেছে শুধু বদলায় নি সেই বিধবা। ৭১ এর সেই বিধবা। এখনো সেই রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে থাকে। ময়লা কাপড়ের আঁচল গড়াগড়ি দেয় মাটিতে। অধির আগ্রহে তাকিয়ে থাকে সামনের পথের দিকে, যেন কারো আসার অপেক্ষায় অধির আগ্রহে বসে আছে অর্ধ শতাব্দী ধরে। হয়তো ফিরবে সে, সামনে দিক থেকে মা মা বলে চিৎকার করে ছুটে আসবে পনেরো বৎসরের সেই দিলু। এসে জড়িয়ে ধরবে মাকে। আর মা আদর করে বুকে নিয়ে বলবে বাবা চল খেতে চল। তোর জন্য যত্ন করে মাছের মাথা দিয়ে পুঁই শাক রেঁধেছি।

বলছিলাম এই অভিজাত্য মহল্লার রাস্তার মোড়ের সেই পাগলি বুড়ির কথা। সারাদিন বসে থাকে রাস্তার মোড়ের ধূলো বালির একপাশে। শরীরের নোংরা কাপড় গড়াগড়ি দেয় ধূলোয়।কখনো নিশ্চুপ আনমনা হয়ে বসে থাকে পথের দিকে চেয়ে। আর কখনো কোনো পথিক কে ধরে জিজ্ঞেস করে- আমার দেলোয়ারকে দেখেছো? লম্বা চুল আর মুখখানা চাঁদের মতো দেখতে?  বুড়ি এই একই কথা আজ অর্ধ শতাব্দী ধরে বলছে। পথিক যদি বলে না দেখিনি তখন বুড়ি বলে কেঁদে কেঁদে বলে- আমার ছেলে যুদ্ধে গেছে। স্বাধীনতার যুদ্ধে, মুক্তি যুদ্ধে, সে তার পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে গেছে। আমাকে বলে গেছে তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু আজো ফিরে নি। পথিক যদি বলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে তাহলে বৃদ্ধ তৃপ্তির হাসি হেসে নিশ্চুপ হয়ে পথের দিকে তাকিয়ে অধির আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে। আর কেউ যদি বলে তার ছেলে আর ফিরবে না তখন বুড়ি ধমকি দিয়ে চেচিয়ে বলে নিশ্চই ফিরবে। আমার ছেলে আসবে। আমাকে বলে গেছে ফিরে আসবে। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। মা মা বলে চিৎকার করে আমার বুকে মাথা রেখে বলবে মা ক্ষিদে পেয়েছে। তখন আমি তাকে ঘরে নিয়ে নিয়ে পেঠ ভরে খাওয়াবো। এরকম নানান কথা বলে বুড়ি চিৎকার করে কাঁদে। সেই কান্নার শব্দে গুঞ্জরিত হয় আকাশ, কাঁপতে থাকে জমিন,  ছিড়ে তছনছ হয়ে যায় বাতাসের দেহ। আর ইটের বালির গড়া দাম্ভিক দেওয়াল পতিউত্তরে হুংকার দিয়ে তীব্র প্রতিধ্বনি করে। সেই প্রতিধ্বনি শুনে বুড়ি থেমে যায় আর গুনগুন করে কাঁদে ।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে এক দিন এ গ্রামে মিলিটারি আসে। এসে আগুন জ্বালিয়ে দেয় বাজারে। পুড়ে চাই হয়ে যায় অনেক মানুষের সংসার চালোনোর একমাত্র অবলম্বন। এই বাজারে চায়ের দোকান ছিলো রহমত আলীর। গাঁয়ের বাজারে চা বিক্রি করে কোন রকম  সংসার চালোতো। গরীব হলেও রহমত আলীর ছোট সংসার নিয়ে খুব শান্তি সুখেই ছিলো। তার ছেলে দেলু গ্রামের স্কুলের ক্লাস সেভেনে আর মেয়ে রাবিয়ার বয়স তখন চার বছর। ছেলে মেয়ে স্ত্রী নিয়ে সুখে দিন কাটতো রহমত আলীর। মেলেটারীরা বাজারে আগুন ধরিয়ে দিলে রহমত মিয়া মিনতি করতে থাকে তার দোকানটাতে আগুন না দেওয়ার জন্য,  ফল হেতু কোপালে পরপর তিনটি বুলেট। লুটিয়ে পড়ে রহমত আলীর নিথর দেহ। ওই দিন রহমত আলীর সাথে একসাথে গনকবরে করব দেওয়া হয় এই গাঁয়েরই চৌদ্দ পনেরো জনের। রহমত আলীর বিধবা স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে পড়লো বিপাকে। ভাবছিলো অনত্র কোথাও চলে যাওয়ার। যাওয়া আর হয়ে উঠেনি। রহমত আলীর শহীদ হওয়ার কয়েকদিন পর মেলেটারিরা রহমত আলীর স্ত্রীকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়, আছড় দিয়ে মেরে রেখে যায় চার বৎসরের রাবিয়াকে।

রহমত আলীর স্ত্রীকে সেখানে দুদিন ধরে শারিরিক নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। সেদিন হতে পাগল হতে শুরু করে রহমত আলীর স্ত্রী। মায়ের করুন অবস্থা দেখে পনেরো তেরো বৎসর বয়সি কিশোর ছেলে আর দমে থাকতে পারে নি। মায়ের হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করে পিতা ও মায়ের ইজ্জতের বদলা নেওয়ার। শত্রুর রক্ত দিয়ে পবিত্র করতে দেশের মাটি।

সেই দিনেই মাতৃভূমি স্বাধীন করার লক্ষে অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়ে দেলু।  যাওয়ার সময় মাকে কথা দিয়ে যায় শীঘ্রই ফিরে আসার। কিন্তু শত্রুরা পালালো, দেশ স্বাধীন হলো,  বাংলার আকাশে হাসলো স্বাধীন রবি কিন্তু আসলো না দিলু। একে একে অনেকেই ফিরে আসলো, যুদ্ধ শেষে হলো বিজয়ের উল্লাস কিন্তু আসলো না সেই বিধবা মায়ের সন্তান।

সেই থেকে রহমত আলীর বিধবা স্ত্রী পথে ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করে। তার একান্ত বিশ্বাস ছেলে ফিরে আসবে। কারণ ছেলে বলেছিলো শীঘ্রই ফিরবে!

দিনে দিনে সব বদলে গেলো, নেই আগের সেই মানুষ গুলো, বেশির ভাগ মানুষিই জানে না রাস্তার মোড়ের এই পাগলির আসল পরিছয়। দিনে দিনে অর্ধ শতাব্দী কেটে গেলো, মাথার কালো চুল সাদা হলো কিন্তু সন্তানের জন্য জননীর অপেক্ষা শেষ হলো না। তার বিশ্বাস তার ছেলে কথার খেলাপ করবে না। একদিন না একদিন ফিরবেই সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *