লাল সবুজের দেশে হ্যান্ডবল - হাতেখড়ি

লাল সবুজের দেশে হ্যান্ডবল

হামিদা রহমান

দিনে দিনে দেশীয় খেলার পাশাপাশি আমাদের দেশে বিদেশি খেলার আগমন ঘটছে। বর্তমানে এদেশের খেলাপ্রিয়রা খেলাধুলা বলতে কেবল ফুটবল এবং ক্রিকেটকেই বুঝে থাকেন তা কিন্তু নয়। এই ফুটবল ও ক্রিকেট ছাড়াও আরো অনেক মজাদার দেশি-বিদেশি খেলা রয়েছে। তেমনি একটি বিদেশি খেলা হলো হ্যান্ডবল। হ্যান্ডবলকে ফুটবলের বিপরীত খেলা বলা চলে। হ্যান্ডবল একটি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ দলগত খেলা। অনেকে এই খেলাকে ফুটবল ও বাস্কেটবলের সমন্বিত রুপ মনে করে থাকে।

হ্যান্ডবল ১৯০৬ সালে ডেনমার্কের জনৈক ক্রীড়াশিক্ষক হোলডার নিয়েলসেন প্রথম এই খেলার নিয়ম আবিষ্কার করেন। ১৯১৭ সালে জার্মানির ম্যাক্স হিসার, কার্ল শিলেঞ্জ ও এরিক কনিগ হ্যান্ডবল খেলার আধুনিক নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করেন। এই খেলাটি এক সময় উত্তর এবং পূর্ব ইউরোপে প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে সারা বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো জনপ্রিয়তা দৃষ্টিগোচর হয়।

এককালে হ্যান্ডবলের গোটা অস্তিত্ব জুড়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। ধীরে ধীরে চীন,হংকং, মালয়েশিয়ায় শক্তিশালী ভাবে এই খেলার আক্রমণ ঘটে। উনবিংশ শতাব্দীর নব্বই দশকের মাঝপথে যুব কমনওয়েলেথ এর উদ্যোগে এক দল মহিলা খেলোয়াড়দের নিয়ে হ্যান্ডবলের হঠাৎ যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশে। এবং যাত্রার শুরুটাই ছিল সাফল্যমন্ডিত। আর এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ) বর্তমান বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতি লে.কর্ণেল (অব.) এম এ হামিদ এ খেলার প্রচলন শুরু করেন।  ১৯৮৪ সালে হ্যান্ডবল খেলাটি তৎকালীন জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের স্বীকৃতি পায়।

হ্যান্ডবল খেলার মাঠের দৈর্ঘ্য ৪০মি. এবং প্রস্থ ২০ মি.। ফুটবল খেলার মতোই হ্যান্ডবল খেলার মাঠের দুই প্রান্তে ২ টি গোলপোস্ট থাকে। এই খেলাটিতে বয়সভেদে সময় নির্ণয় করা হয়। ১৬ বা তার উর্ধ্বে ছেলেমেয়েদের জন্যে ৭০ মিনিট। ১২-১৬ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্যে ৬০ মিনিট এবং ৮-১২ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য ৫০ মিনিট। এই খেলাটিতে ২ জন রেফারি পরিচালনা করেন। তার সহযোগিতায় ৪ জন অফিসিয়াল, ১ জন সময় রক্ষক ও ১ জন স্কোরার থাকেন। এই খেলার আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ১ জন খেলোয়ার ৩ সেকেন্ডের বেশি সময় বল ধরে রাখতে পারবে না। এ খেলাতেও ফুটবলের মতো পেনাল্টি থ্রো রয়েছে। সঠিক কলাকৌশল, পাসিং, থ্রোয়িং এবং শারীরিক শক্তি এই খেলার সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র।

অলিম্পিকে প্রথম হ্যান্ডবল শুরু হয় ১৯৩৬ সালে জার্মানির বার্লিনে। এই অলিম্পিকটি ছিল পুরুষদের। অতঃপর ১৯৭৬ সালে কানাডায় মেয়েদের অলিম্পিক শুরু হয়। অলিম্পিক হ্যান্ডবল ছাড়াও হ্যান্ডবলের খেলার বড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে পুরুষ ও মহিলাদের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ। ঐতিহ্যগতভাবে হ্যান্ডবল ইনডোর গেম হলেও বর্তমানে আউটডোর বীচে হ্যান্ডবল খেলা হয়ে থাকে।

বর্তমানে আমাদের দেশে এই খেলার প্রসারতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এর নিয়মিত চর্চার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আন্তঃস্কুল হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা, আন্তঃকলেজ হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসকল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে থাকে। তবে আন্তঃস্কুল পর্যায়ে এই খেলার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের হ্যান্ডবলের অগ্রযাত্রা এবং এই খেলার উন্নতির সাথে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত ১৯৯১ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত স্কুল হ্যান্ডবলে অংশ নেয়। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের দেশের সম্মান বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ টি জেলায় নিয়মিত লীগ/টুর্নামেন্ট/স্কুল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়াও জাতীয় প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় হ্যান্ডবল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে স্কুল কলেজ পর্যায় থেকেই শিশু কিশোররা এ খেলা সম্পর্কে জানতে পারছে এবং এধরনের আয়োজনে গ্রামের শিশু-কিশোরদের মতোই শহরের শিশুরাও দিন দিন খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করতে পারলে বাংলাদেশের এই শিশু-কিশোররাই একদিন হ্যান্ডবলের মাঠ কাঁপাবে এবং নিজেদের বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *