সুস্থ থাকার উপায় জানি - হাতেখড়ি

সুস্থ থাকার উপায় জানি

তাহাজুল ইসলাম ফয়সাল

ক্লাস শেষে প্রাইমারী স্কুলের সিঁড়ি দিয়ে হৈহুল্লোর করতে করতে বাড়ি ফেরার আনন্দ হয়তো সবাই উপভোগ করতে পারেনি। একটা সময় বলতে গেলে সকল শ্রেণি পেশার সবার সন্তানদের পড়ালেখার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই ছিল ভরসা। দু’একটা প্রাইভেট স্কুলও ছিল তবে এখনকার মতো এতোটা না। ক্লাসে শিক্ষকের সাথে গলা মিলিয়ে রিডিং পড়া খুব একটা দেখা যায় না এখন। স্কুলের গেটে দাড়োয়ান, আয়া-বুয়া এতো কিছু ছিলই না। আবদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরাতো গলা ছেড়ে কথাও বলতে পারে না, দেখা যায় ফিসফিস করে একে অপরের সাথে কথা বলছে। যখন স্কুলে পড়তাম সপ্তাহে একদিন ক্লাস ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে ক্লাসরুম ঝাড়ু দিতে হয়েছে পালাবদল করে সবাইকে। আর মাসে একদিন স্কুল মাঠ ও তার তার চারপাশ পরিস্কার করা, মাঠের ঘাস কাটা ও গাছের যত্ন নিয়েছি প্রাইমারি স্কুলে। স্কুল ভ্যানতো দূরের কথা কেউ রিক্সা করে স্কুলে আসলে সহপাঠিরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। আর বলতো- কিরে তুই ল্যাংরা নাকিরে!

কিন্তু এদৃশ্য পাল্টে গেছে অনেক বছর আগেই। স্কুলের শিক্ষার্থী তো দূরের কথা মা-বাবাইতো দু-চার মিনিটের পথ রিক্সা ছাড়া চলেন না। শিশুদের রিক্সায় চড়ার অভ্যাসটা মা-বাবারাই ছোটবেলা থেকে তৈরী করে দেন। স্কুল, কোচিং, বাজার এমনকি কাছে কিনারের দোকানেও পায়ে হেঁটে যেতে চায়না কেউই। হয়তো ভাবছেন এসব নিয়ে ভাববার কি আছে! হ্যা ভাববার অনেক কারণ আছে। যেখানে আমরা দিন দিন মাঠ হারাচ্ছি সেখানে শিশুর শারীরীক পরিশ্রম কমবে এটাই স্বাভাবিক। শিশুর একমাত্র হৈহুল্লোরের জায়গা স্কুল। সেখানেও সবার জন্য খেলার মতো কোন মাঠ নেই। ফলে শিশুরা তার বিনোদন ও অবসর কাটানোর বিকল্প বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক। অবসর কাটানোর জন্য একমাত্র উপায় বলতে গেলে ফাস্টফুডের দোকান। ফাস্টফুডের এসব একএকটা খাদ্যে প্রায় দুই হাজারের বেশি কিলোক্যালারি এবং কমবেশি ৯০ গ্রাম চর্বি থাকে। তাছাড়া আমরা যেসব কোমল পানীয় ও জুস পান করি তার মাধ্যমে প্রতিবারে আমাদের শরীরে ৫৬০ কিলোক্যালারি জোগান হয়। আর ভয়ংকর সত্য এটাই যে, এই ক্যালরি শরীরে মেদ বাড়ায় এবং শরীরের ওজন বাড়তে থাকে। শহরের শিশুরা হাঁটে কম তাই শারীরীক পরিশ্রম খুব একটা করতে হয় না। অন্যদিকে ফাস্টফুডসহ বাহিরের খাবার শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমাতে থাকে। আর এভাবেই শিশুরা দিন দিন মুটিয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যার পর পড়তে বসা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কাজ। স্কুলের দেয়া বাড়ির কাজ শেষ করে রাতের খাবার গ্রহণ ও তারপর দাঁত ব্রাশ করে ঘুমিয়ে পড়া। কিন্তু এমটা হচ্ছে হচ্ছে কি? মোটেও না। অধিকাংশ শিশু গেমস, কার্টুন-মুভি দেখা অথবা স্যোসাল মিডিয়াসহ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে রাত জাগার একটা অভ্যাস গড়ে ওঠে। আর তাই শরীরের লেপটিন –এর মাত্রা কমে যায় ও গ্রিলিন এর মাত্রা বাড়তে থাকে। এতে করে শিশুর খাবারে অতিরিক্ত রুচি চলে আসে। যেহেতু বাড়িতে খুব কম সংখ্যক মায়েরা টিফিনের নাস্তা তৈরী করে দেন। সেহেতু শিশুরা ঘুরে ফিরে সেই ফাস্টফুডের খাবারেই স্বাদ নেয়। আর দিন দিন শরীরের ওজন বাড়াতে থাকে।

এই ওজন বাড়াটা কতটা ভয়ানক হতে পারে আমরা সবাই জানলেও মানতে পারি কতজন! শরীরে অতিরিক্ত ওজন বাড়ার ফলে হৃদরোগ ও হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে দ্বীগুন। রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলস্টেরল ও ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কাতো থাকছেই। মেয়েদের ক্ষেত্রে হরমজনিত সমস্যা তৈরী হয় এবং যা ভবিষ্যতে সন্তান গ্রহনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এসব কথা ডাক্তারদের কাছে আমরা সব সময়ই শুনে থাকি। কিন্তু কোনভাবেইতো সমাধান করা যাচ্ছে না। আসলে কোন সমস্যা যেমন একদিন তৈরী হয়নি সমাধানও হঠাৎ হবে এমটা আশা করা ঠিক নয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া রোধ করে সুস্থ থাকতে হলে প্রথমেই কিছু অভ্যাস তৈরী করা জরুরী।

  • ছোট থেকেই মোবাইল বা কম্পিউটার দেখিয়ে খাওয়ানোর অভ্যাস না করানো উচিৎ। কেননা এই অভ্যাসের কারণেই শিশু বয়সে অতিরিক্ত মাত্রায় মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে।
  • আইসক্রিম, চকলেট, জুস, চিপস শিশুদের জন্য উপহার হিসেবে না নিয়ে বা কোথাও বেড়াতে গেলে এসবের পরিবর্তে ফলমুল নিয়ে যাওয়া।
  • শাক-সজ্বির প্রতি অভ্যাস গড়তে একই রকমের রান্না না করে রান্নায় মাঝে মাঝে পরিবর্তন আনা। এবং স্কুলের টিফিন বাড়ি থেকে তৈরী করে দেয়া।
  • পরিবারের সবার সাথে বসে খাওয়াটাও খুব গুরুত্বপুর্ণ। শিশু একাএকা খেলে হয়তো তার রুচি ও খাবারে কোন অনিহা থাকলো কি না তা অজানা থেকে যায়।
  • ছোটখাটো অনুষ্ঠানে বা জন্মদিনে ফাস্টফুডে খাওয়া অথবা ফাস্টফুড থেকে খাবার না এনে বাড়িতে খাবার তৈরী করে খাওয়ানো উচিৎ।
  • অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাদ্য, তেল ও চর্বিযুক্ত খাবারকে যতটা দূড়ে রাখা যায় ততটাই স্বাস্থের জন্য ভাল।
  • সবার উচিৎ পায়ে হাঁটার দূরুত্বে শিশুকে স্কুলে ভর্তি করা। এতে করে পথে সময় নষ্ট হবে না ও শিশুও স্কুলে যেতে বিরক্তবোধ করবে না।
  • শিশুকে নিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া ও কাছে কোথাও গেলে শিশুকে সাথে করে হাঁটিয়ে নেয়া। এর মধ্যদিয়ে শিশুর হাঁটার অভ্যাস গড়ে উঠবে। আর যদি বাড়ির আশেপাশে খেলার মাঠ থাকে তবে প্রতিদিনই কিছু সময় শিশুকে খেলতে দেয়া।

আমরা হয়তো সেই আনন্দের শৈশবকে ফিরিয়ে আনতে পারবো না। কিস্তু দৈনন্দিন জীবনে ছোটখেোট কিছু পরিবর্তন আনলে সুস্থ থাকতে পারবো। আর যে শৈশবটা আছে সেটাকই নিজেদের মতো করে আনন্দের করতে পারবো।

লেখক: শিশু সংগঠক ও সম্পাদক, হাতেখড়ি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *