ভার্চুয়াল ভাইরাসের মরণ-আগ্রাসন থেকে সন্তানকে বাঁচান

অরণ্য সৌরভ:

ফেসবুক, সেলফি, ইউটিউব, গেম আসক্তি ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মাদকাসক্তের চেয়েও মারাত্মক। এর মর্মান্তিক পরিণতি শুধু আপনাকে নয়, ধ্বংস করে দিতে পারে পরিবার, সমাজ এমনকি একটি জাতিকেও। তাই আসুন, সময় থাকতে সচেষ্ট হই। এই ভার্চুয়াল ভাইরাসের মরণ-আগ্রাসন থেকে নিজে বাঁচি, বাঁচাই সন্তানদের, বাঁচাই প্রিয় দেশবাসীকে।

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফেসবুক ব্যবহারকারী শহর ঢাকা। এই চত্বরে যে যত বেশি সময় কাটায়, সে হয়ে পড়ে তত হতাশ, একাকী, পরিবার বিচ্ছিন্ন । এটি আমার কথা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও বিজ্ঞান সাময়িকীর কথা।

ভার্চুয়াল ভাইরাসের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। এখন বিশ্বে প্রতি তিন জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু। (ইউনিসেফ রিপোট-২০১৬) পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড এর গবেষণা অনুযায়ী, যে সব শিশু কম্পিউটার, টেলিভিশন ও ভিডিও গেম নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকে তারা হয়ে পড়ে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ও হীনমন্যতার স্বীকার।

শিশুদের অনিদ্রা, মেদস্থূলতা, আগ্রাসী মনোভাব, আত্মবিশ্বাসহীনতার অন্যতম কারণ স্কিন আসক্তি। যে শিশুরা কম্পিউটার স্কিনে সেঁটে থাকে, তারা কিছুতেই দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। খুব অল্পতেই অধৈর্য, রাগারাগির টেন্ডেন্সি বেশি দেখা যায়।

একটি পশুকে পশু হয়ে উঠতে কোন ট্রেনিং এর প্রয়োজন হয় না কিন্তু একটি শিশুকে মানুষ হিসেবে তৈরী করতে তাকে নানান ট্রেনিং, শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, একটি স্বর্ণের বার যখন আপনার আলমারিতে থাকে এটি নিঃসন্দেহে মূল্যবান। আপনি এই সম্পদ নিয়ে মনে মনে স্বস্তি ফিল করবেন, নিজেকে নিরাপদ ভাববেন। কিন্তু যখনই আপনি কোন প্রোগ্রামে এই বার গলার লকেট হিসেবে পরে যেতে চাইবেন, এটি নিশ্চয় আপনার সৌন্দর্য বর্ধন করবে না। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রয়োজন বারকে অলংকারে রূপান্তরিত করা। যে অলংকার যত সুন্দর হবে সে তত আপনার সৌন্দর্য বর্ধন করবে। অর্থাৎ বারকে অলংকারে রূপান্তরের জন্য দরকার একজন দক্ষ কারিগর। আর শিশুকে মানুষে রূপান্তরের
কারিগর হলেন বাবা-মা।

ভাবুন তো আমরা আমাদের সন্তানকে কতটুকু কোয়ালিটি টাইম দিই? বাসায় হয়তো সবাই থাকি, কিন্তু যে যার মতো। গৃহিকর্ত্রী রান্না-টিভি দেখা, হাসবেন্ড পত্রিকা-ফেসবুক, সন্তান কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত। তাহলে সবার মাঝে মমত্বের বন্ধন কি ভাবে গড়ে ওঠবে? যদি মনে করা হয় পড়াশুনা যা করাবে সেটা স্কুল, কোচিং কিংবা গৃহশিক্ষক করাবে এখানেই হবে একজন গার্ডিয়ানের সবচেয়ে বড় ভুল। এই সকল শিক্ষার মাঝেও শিশুর সবচেয়ে প্রয়োজন যে শিক্ষা তা হলো নৈতিক শিক্ষা। যে জাতির নৈতিকতা নেয়, সে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে না। আর এই নৈতিকতা কেবল পরিবার থেকেই পাওয়া সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ, সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়া। মমত্ববোধের মানে এই নয় যে, সন্তানকে পরনির্ভরশীল করা; মমত্ববোধ হচ্ছে মমতা দিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত সৈনিক তৈরি করা, তাকে স্বনির্ভর করা।

প্রশ্ন পত্র ফাঁসের যে মহামারি লেগেছে তা থেকে জাতি কখনো বেরুতে পারবে বলে মনে হয় না। এই মহামারী রোধ করতে পারে ছাত্রছাত্রী আর গার্ডিয়ানের নৈতিকতা। গার্ডিয়ান যদি মনে করে আমার সন্তান যতটুকু পড়েছে আমি ততটুকুই রেজাল্ট দেখতে চাই, চাই না আমার মিথ্যে জিপিএ ৫, চাইনা গোল্ডেন এ+ তাহলে প্রশ্ন ফাঁস বাণিজ্য কি করে সাসটেইন করবে? যেখানে ভোক্তাই নেয়, সেখানে বাণিজ্যও নেই।

তাই আসুন এখনই সচেতন হই সন্তানের প্রতি। তাদের কোয়ালিটি টাইম দিই মমতার সাথে, যে কোন সমস্যা সন্তানদের নিজেকে সমাধান করার জন্য অনুপ্রেরণা দিই। পাশাপাশি সবচেয়ে দরকার স্মার্টফোন আসক্তি থেকে বের করে আনা।

যা করবেন না:
১. টিভি, স্মার্টফোন, ট্যাব চালিয়ে সন্তানকে খাবার খেতে অভ্যস্ত করবেন না।
২. সন্তানকে বই পড়া, খেলাধুলা, ব্যায়ামে উৎসাহিত করুন ও পরিবারের প্রাত্যহিক কাজে তার উপযোগী অনুযায়ী সম্পৃক্ত করে দিন।
৩. বয়স ১৮ এর আগে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেবেন না।
৪. রাত ১১ টার পর ভার্চুয়াল জগৎ থেকে দূরে থাকুন।
৫. সন্তানের বন্ধু-বান্ধব কে তা খেয়াল করুন ও তাদের সম্পর্কে জানুন।
৬. সন্তান যদি রুমের দরজা বন্ধ করে ভেতরে থাকার অভ্যাস করে তার প্রতি বাড়তি নজর দিন আর এই অভ্যাস পরিহার করাতে চেষ্টা করুন।

৭. কম্পিউটার রাখুন লিভিং রুমে, খোলা স্থানে যেন সন্তান কম্পিউটারে যাই করে আপনার চোখের সামনে করে।
৮. সন্তানের প্রতি মনোযোগী হোন। সন্তান বাঁচুক, পরিবার বাঁচুক, সমাজ বাঁচুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *