গল্প । বেস্ট ফ্রেন্ড - হাতেখড়ি

গল্প । বেস্ট ফ্রেন্ড

বেস্টফ্রেন্ড
ফাহিমা রিপা

তিন্নি দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। পড়াশুনায় খুব ভালো। পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে এবং জিতেও। আজ তার জন্মদিন, আঠারতে পা দিলো। তিন্নির অনেক ইচ্ছে ছিল আঠারতম জন্মদিন অনেক ধুমধাম করে সেলিব্রেট করবে। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই উপস্থিত থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা তার বেস্টফ্রেন্ড উপস্থিত থাকবে। তাই তার মা মিসেস রিনি সেইভাবেই আয়োজন করছে। এক সপ্তাহ আগে থেকেই সব আয়োজন শুরু হয়েছে।  জন্মদিন ছাড়াও আজকের দিনটা তিন্নির জন্য স্পেশাল।

“বাবা দিবস” উপলক্ষ্যে অনলাইনে গল্প লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তিন্নি সেখানে “বেস্টফ্রেন্ড” নামে একটা গল্প জমা দেয়। লেখালেখি, বইপড়ার অভ্যাসটা পেয়েছে তার বাবার কাছ থেকে। তিনিও একসময় পেপারে নিয়মিত লেখালেখি করতেন শখের বসে। হাজার হাজার গল্পকে ছাপিয়ে তিন্নির সেই লেখা সেরার সেরা হয়। আজকে সেই প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

তিন্নি আয়নার সামনে বসে চুল বাঁধছে। কিন্তু মনটা বারবার চলে যাচ্ছে ছোটবেলার দিনগুলোয়। বাবার পাশে বসে গল্পের বই পড়া,বাবা অফিস থেকে ফিরলে ছুটে গিয়ে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়া, জ্বরের সময় বারবার বাবাকেই পাশে খোঁজা,বাবার কাছে মায়ের নালিশ করা, বাবার পকেট দুটো ঝুড়িঝুড়ি আবদারে ভরিয়ে তোলা আরও কত কি…! এমনও হয়েছে বাবা রুমে ঢুকলে তিন্নি যত গভীর ঘুমেই থাকুক না কেন সে টের পেয়ে যেত, তার বাবা এসেছে। সারাদিনের কথাগুলো বাবার সাথে শেয়ার না করলে তার যেন দিনই কাটতে চাইতো না।

কিন্তু চাকরির সূত্রে বাবাকে এখন বিদেশ থাকতে হচ্ছে। তিন্নি যখন ক্লাস ফোরে পড়ে তখনই তার বাবা লন্ডন চলে যায়। অবশ্য ছুটি পেলে দেশে ফিরে। কিন্তু কয়েকবছর ধরে কাজের এতো চাপ যে ছুটির জন্য অ্যাপ্লাই করেও পায় নি। তাই তিন্নির বাবার উপর অনেক অনেক অভিমান জমে আছে। প্রতিবার জন্মদিনের আগে বাবা কথা দেয় যে তিনি যে করেই হোক আসবেন। কিন্তু কাজের চাপে দেশে আর ফেরা হয়ে উঠে না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে তিন্নির চোখ জ্বলে ভরে যায়। বারবার ঘোলা হয়ে আসে সামনের দিকটা। মা এতক্ষণ রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করছিলেন।

মিসেস রিনি এসে তিন্নির মাথায় হাত রাখিতেই তিন্নি নিজের মধ্যে ফিরে আসে। তিনি তিন্নিকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“কি হয়েছ তিন্নি?”
“কিছুই না আম্মু”
“তাহলে আজকের মতো আনন্দের দিনে তোমার চোখে জল কেন?”
“বললাম তো কিছুই হয় নি আম্মু”
“তুমি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তোমার বেস্টফ্রেন্ডকে মিস করছো…!”
“না মানে…”
“খুব অভিমান হয়েছে বেস্টফ্রেন্ডের উপর তাই না…!”
এসব কথা বলতে বলতে তিনি তিন্নির চুল বেঁধে দেন। তিন্নি রেডি হয়ে তার মায়ের সাথে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য রওনা হয়। অনুষ্ঠানে সবাই তিন্নির গল্পের খুব প্রশংসা করছিল। তিন্নির খুব ভালোই লাগছিল। কিন্তু কোথায় যেন একটা শূন্যতা তিন্নিকে গ্রাস করার চেষ্টা করছিল।বাসায় ফিরার কিছুক্ষণের মধ্যে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবরা আসতে শুরু করেছে।

তিন্নির চাচাতোবোন মেহেক টিভিটা অন করে চ্যানেল চেঞ্জ করছিল। এমন সময় একটা চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজে বলছিল,লন্ডন থেকে বাংলাদেশীগামী একটা প্লেন নিখোঁজ।

খবরটা শুনতেই মিসেস রিনির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিন্নি মায়ের প্রতিক্রিয়া দেখে খুব অবাক হলো। মায়ের কাছ থেকে জানতে পারল এই প্লেনেই তার বাবা দেশে ফিরছিল। তিন্নিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। কথাটা শুনে তিন্নির রাগ অভিমান মুহূর্তেই গলে পানি হয়ে গেলো। নিজের উপর খুব রাগ হতে লাগলো, শুধুই বাবার উপর রাগ করেছে। আর বারবার একটা দোয়াই করতে লাগলো, তার বাবার জন্য কিচ্ছু না হয়ে থাকে। বাবার যেন খোঁজ পাওয়া যায়।

এভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে গেলো। একটু পর কলিংবেল টেপার আওয়াজ শুনে তিন্নি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। তিন্নি জন্য পৃথিবীর সব আনন্দ, সবচেয়ে বড় বার্থডে গিফট পেয়ে গেছে। তিন্নি চিৎকার দিয়ে তার মাকে ডাকলো। তিন্নির “বেস্টফ্রেন্ড” তার বাবা এসেছে। পরে জানতে পারলো তার বাবা নিখোঁজ হওয়া প্লেনের আগে ফ্লাইটে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *