বীরপ্রতীক তারামন বিবির অজানা অধ্যায় - হাতেখড়ি

বীরপ্রতীক তারামন বিবির অজানা অধ্যায়

খালিদ আহম্মেদ রাজা:

একাত্তরের রণাঙ্গনে সাহসী এক বীরকন্যার নাম তারামন বিবি। যিনি ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুস সোহবান এবং মায়ের নাম কুলসুম বিবি। ছোট থাকতেই বাবা মারা যান। মা তখনো বেঁচে ছিলেন। সাত ভাই-বোনকে নিয়ে কষ্টের সংসার ছিল তাদের। তারা বেশিভাগ সময় খাবারের অভাবে ভুগেছিল।

তারামন বিবির স্বামীর নাম আবদুল মজিদ। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ২০১৮ সালে মৃত্যুর পূর্ব প্রযর্ন্ত তিনি কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখ শান্তিতে বসবাস করতেন।

তখন সময়টা ছিল চৈত্র মাস। দেশে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।। পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়িঘর। নারীদের উপর শারীরিক নির্যাতন করেছিল তারা, আতঙ্ক ছিলো চারদিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তখন তারামন বিবি অনেক ছোট। বয়স আনুমানিক হবে ১৪-১৫। তারামন বিবির মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে মুহিব হাবিলদার ধর্ম মেয়ে করে নেন তাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়তা করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজ মাস্টার। এরপর তারামন বিবি চলে যায় কোদালকাঠির দশঘরিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেখানে রান্না করা, খাবার ডেক পরিষ্কার আর অস্ত্র পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। এটি ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি যুদ্ধ ক্যাম্প। শুরু হয় তার যুদ্ধের জীবন।

তারামন বিবি ১১ নং সেক্টরে নিজ গ্রাম কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরে ছিলেন। তখন ১১ নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। যিনি তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে ক্যাম্পে রান্নাবান্নার জন্য নিয়ে আসেন। তখন তারামনের বয়স ছিলো মাত্র ১৩ কিংবা ১৪ বছর। কিন্তু পরবর্তীতে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালনো শেখান। পরবর্তীতে সহকর্মীদের কাছ থেকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের সাথে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারামন বিবি গোয়েন্দা তথ্য আনতে বেরোলে মাথায় গোবর লাগিয়ে, মুখে কালি দিয়ে উপুড় হয়ে গড়াতে গড়াতে শত্রুর কাছাকাছি চলে যেতেন তারামন বিবি। কোথায় শুত্রুর অস্ত্র আছে, কোথায় অপারেশন চালাতে হবে, এসব তথ্য এনে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, তারামন বিবির কথার সুত্র ধরে তারপর শুরু করতেন পরিকল্পনা মাফিক অপারেশন। এই ভাবে কাজ করতেন তিনি। তারামন বিবি সহ অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশকে স্বাধীন করে। পরে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন লাভ করে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসীকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ নম্বর ৩৯৪। গেজেটে নাম মোছাম্মৎ তারামন বেগম। কিন্তু ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি’দে প্রথম তার সন্ধান পান। এ কাজে বিমল কান্তিকে সহায়তা করেন কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী। এরপর নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ কার কয়েকটি সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে।সেই সময় তাকে নিয়ে পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার এক অনাড়ম্বর পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তারামন বিবিকে বীরত্বের পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন।তারামন বিবিকে নিয়ে আনিসুল হকের লেখা ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ নামক একটি বই রয়েছে। আনিসুল হক রচিত ‘করিমন বেওয়া’ নামক একটি বাংলা নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন তারামন বিবি।

দীর্ঘদিন ধরে বক্ষব্যাধিসহ নানা রোগে ভুগছিলেন তারামন বিবি। গত ৮ নভেম্বর রাজীবপুর থেকে নিয়ে ময়মনসিংহ সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) ভর্তি করা হয় তাকে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয় তারামন বিবিকে। সেখানে চিকিৎসা শেষে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে সপ্তাহখানেক পর তাকে কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তবে স্বজনদের সুত্র অনুযায়ী, (৩০ নভেম্বর) শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তারামন বিবির শারীরিক অবস্থার আবারও অবনতি হয়। তখন তাকে রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: দেলোয়ার হোসেন বাড়িতেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন। কিন্তু শনিবার ২০১৮ সালে (১ ডিসেম্বর)  রাত দেড়টার দিকে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন তারামন বিবি। পরে বীরকন্যা তারামন বিবির জানাযার দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয় ও তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরকন্যা বীরপ্রতীক তারামন বিবির বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *