বিশ্বজিৎ দাসের গল্প শেষ ইচ্ছা - হাতেখড়ি

বিশ্বজিৎ দাসের গল্প শেষ ইচ্ছা

শেষ ইচ্ছা
লেখক: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

সকালে ঘুম থেকে উঠে রাকিব জানতে পারে,পাশের বাড়ির নীলাকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।গতকাল বিকেলে কোচিং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ছিলো আর ফেরেনি।নীলাদের বাসার সামনে এলাকার অনেকে জড়ো হয়েছে।রাকিবও সেখানে এসেছে।কেউ বলছে মেয়ে কারও সাথে পালিয়ে গেছে,কেউ বলছে নীলাকে অপহরণ করা হয়েছে।কিন্তু অপহরণ করলে তো এতক্ষণে টাকার জন্য ফোন আসতো অপহরণকারীদের।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেদিন বিকেলের দিকে নীলার লাশ পাওয়া যায় এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে।কে বা কারা তাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করে এখানে ফেলে রেখে গেছে।পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠায়।পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও আসে নীলাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

নীলার লাশ এখন বাড়ির উঠানে রাখা হয়েছে।অনেক লোক জড়ো হয়েছে।নীলা হত্যাকাণ্ড নিয়ে কয়েকদিন এলাকায় খুব আলোচনা চলল।অনেকে বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করলো।পত্র-পত্রিকায়, ফেইসবুকে অনেক লেখালেখি হয়েছে।
পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা হয়েছে।কেউ বলছে মেয়ের চরিত্র ঠিক ছিলো না, আবার কেউ বলছে মেয়ে পর্দা করতো না,তাই এমন হয়েছে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিচারের আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। তবে এখানেই শেষ,এরপর কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ভুলে যায় নীলার কথা।

রাকিব প্রায়ই ফেইসবুকে,পত্র-পত্রিকায় টিভিতে ধর্ষণের খবর দেখে।এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী ধরা ছোঁয়ার বাইরে।কিছু অপরাধী হয়তো ধরা পড়ে কিন্তু অধিকাংশই টাকার বিনিময় ছাড়া পেয়ে যায়।আর মানুষ কলঙ্ক এঁকে দেয় নিরঅপরাধ মেয়েটির চরিত্রে। এই কলঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ধর্ষনের শিকার অনেক মেয়ে।আবার ধর্ষণের পর অনেক মেয়েকে হত্যা করে ধর্ষণকারীরা।এতসব কিছুর পরেও ধর্ষণকারী বিচার ব্যবস্থা কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়ায়।

এসব দেখে রাকিবের মনেও ইচ্ছা জাগে ধর্ষণ করার।তার মনে হয় সে ধর্ষণ করলে তারও কিছু হবে না,কারণ এদেশের বিচারে ধর্ষণকারীকে দোষারোপ করা হয় না,শাস্তি দেওয়া হয় না।বিচার হয় ধর্ষিতার।দোষারোপ করা হয় ধর্ষিতার চরিত্র কে।তাছাড়া তার বাবা সমাজের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।তার কোন ক্ষতিই হবে না। তার বাবা সব সামলে নেবে। কিন্তু মন থেকে সাহস পাচ্ছিল না রাকিব।

এমন সময় তার বন্ধু হাসান যেন তার ইচ্ছা পূরণের দূত হিসেবে হাজির হলো।হাসান অনেকদিন ধরেই জেরিন নামের একটি মেয়েকে পছন্দ করে কিন্তু মেয়েটি তাকে পাত্তা দেয় না।তাই মেয়েটিকে ধর্ষণ করে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।হাসান রাকিবকে প্রস্তাব দেয় জেরিনকে ধর্ষণ করার।রাকিব সাথে সাথেই রাজি হয়ে যায়।কারন সে মনে মনে এরকমই কিছু চাচ্ছিল।তাই রাকিব অবচেতন মনেই বলে উঠে “হ্যা,আমি তো চাই।আমি ধর্ষণ করতে চাই!”

দুইদিন পর কৌশলে রাস্তা থেকে জেরিনকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় রাকিব আর হাসান।নিয়ে যায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে।তারপর ধর্ষণ করে জেরিনকে।ওরা ধরা পারে যেতে পারে এই ভয়ে হত্যা করে জেরিনকে।তারপর লাশটাকে লুকানোর জন্য বস্তাবন্দী করতে থাকে।কিন্তু এরমধ্যেই  ঘটে যায় বিপদ।নির্মাণকাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিক দেখে ফেলে ওদের।লোকটাকে দেখে বিপদ বুঝতে পেরে দৌড়ে পালিয়ে যায় হাসান। কিন্তু পালাতে পারে না রাকিব।ধরা পড়ে যায় সে।পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে।

জেরিনের লাশ পোস্টমর্টেম করে প্রমাণ মিলে যে রাকিবই জেরিনকে ধর্ষণ করেছে এবং ধর্ষনের পর হত্যা করেছে।সেই ধর্ষণ ও হত্যায় হাসানেরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।কিন্তু হাসান এখনও পলাতক।

আজ রাকিবকে কোর্টে নেওয়া হবে। তারপর তার বিচার হবে।রাকিব ভেবেছিল তার বাবা তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন।কিন্তু রাকিবের বাবা ইলিয়াস পাটুয়ারী ছেলের পক্ষ না নিয়ে সত্যের পক্ষ নিলেন।ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য কোন চেষ্টাই তিনি করলেন না।এমনকি ছেলের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে যাননি।

বিচারে প্রমাণিত হলো যে রাকিবই জেরিনকে ধর্ষণ করেছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।তাই বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন এবং আরেক অপরাধী হাসানকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিলেন।

জেলের অন্ধকার ঘরে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনছে রাকিব।অবশেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ঠিক হলো।পরিবারের সাথে শেষবারের মত দেখা করার সুযোগ দেয়া হলো তাকে।এবার আর ইলিয়াস পাটুয়ারী না এসে পারলেন না।শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে এলেন ঠিকই কিন্তু রাকিবের সাথে কোনো কথা বললেন না।নিরবে চোখের জল ফেললেন শুধু।বাবার এরকম আচরণে খুব কষ্ট পায় রাকিব।সে আর কারো সাথেই দেখা করে না।রাকিব এখনও নিজেকে নিরঅপরাধী ভাবছে।ধর্ষণ তার কাছে কোন অপরাধই নয়,শুধুই আনন্দ।

ফাঁসির মঞ্চে উঠানো হলো রাকিবকে।শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়।উত্তরে রাকিব জানায়,আমিও বাকি ধর্ষকদের মত মুক্তি চাই।আমি তো কোন অপরাধ করিনি,কারন আমি তো শুধু ধর্ষণই করেছিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *