রহস্যঘেরা প্যারালাল ইউনিভার্স! - হাতেখড়ি

রহস্যঘেরা প্যারালাল ইউনিভার্স!

গাজী ইসরাত প্রীতি:

আমরা কতটুকু জানি এ বিষয়ে? শুনেছি কখনো? কিংবা এ নিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ডিসকাশন অথবা খুব আগ্রহী হয়ে করেছি ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি? হয়ত করিনি। আজকে আমার এই লেখাটি পড়বার সাথে সাথে রহস্যঘেরা সমান্তরাল ভ্রম্মান্য সম্পর্কে জানতে পারবে।

বিজ্ঞান! যা ধীরে ধীরে নয় বেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সব রহস্যের কিনারা করতে। বিজ্ঞানের বিকশিত হওয়া একটি নতুন ধারণা হচ্ছে এই Parallel Universe!

ধারণাটি আমাদের এটা বলে যে আমাদের ইউনিভার্সের বাইরে আমাদের মত দেখতে বা আমাদের প্রতিরূপ হয়তবা মজুদ আছে। তার জীবনের সবকিছুই প্রায় আমাদের মতই। চিন্তা-ভাবনা, সম্পর্ক, আপনজন এমনকি সম্পূর্ণভাবেই আমাদের মত দেখতেও! এবার হয়ত আমরা বেশ নড়েচড়ে বসেছি। আমাদের মত দেখতে? সেটা কিভাবে সম্ভব? আমাদের টুইন? কিন্তু সে কোথায় আছে? আর তার সাথে আমাদের সবকিছু মিলে যায়? আমরা কি তাদেরকে কখনো দেখতে পাবো?

এরকম হয়ত হাজারো প্রশ্নের জন্ম হয়েছে তোমাদের মনে। বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এবং কিছু বিষয় আমাদের সাথে শেয়ার ও করেছেন বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে। সঠিক অর্থে সমান্তরাল ভ্রম্মান্য কি?

  • আমাদের ভ্রম্মান্যের বাইরেও কিন্তু একইরকম একের অধিক ভ্রম্মান্য হতেই পারে। যাকে আমরা প্যারালাল ইউনিভার্স বলি।

প্রশ্ন হচ্ছে এই অধিক আলোচিত, রহস্যঘন ভ্রম্মান্যগুলি আসলে কোথায়? বিজ্ঞান এটা বিশ্বাস করে যে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি জীব আর প্রতিটি স্থিতির অনুরূপ আছে কোথাও না কোথাও। ধরো, তুমি একজন মানুষ, একটা স্বত্তা।  যেটা তোমার জীবনে হতে পারতো সেটা হয়ত আজকে অন্য কারো জীবনে হচ্ছে। অস্বাভাবিক শুনা গেলেও এটাই ধারণা করা হয়। মূলত এই ইউনিভার্সেরর রহস্য নিয়ে যত প্রশ্ন আসবে সবকটাকেই খুব ছোট্ট করে ‘সম্ভাবনা’ বলে এক্সপ্রেস করা যেতে পারে। হুট করে বললে হয়ত এই সম্ভাবনা বলবার কারণ তোমার কাছে অস্পষ্ট মনে হবে। কিন্তু তুমি কিছুটা ধারণা নিয়ে চিন্তা করলে তোমার কাছে পরিষ্কার হবে বিষয়টি। বিজ্ঞানীদের কাছে এই ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’ একটি ধাঁধাঁর মত কাজ করছিলো। তারপর তারা এই রহস্যটিকে বেশ কয়েকটি লেবেলের সাহায্যে প্রমাণ করতে চায়।

  • লেবেল-১

আমরা এখনো জানিনা আমাদের বাস করা এই স্পেসটির এ্যাডজেক্ট আকার কি! এক থিউরি অনুযায়ী এটি ফ্ল্যাট আকারের এবং এর বিস্তারের গতি অনন্ত।যদি এরকমটাই হয় তাহলে এই অগণিত ব্রম্মান্ড হবার সম্ভাবনা কিন্তু বেশ বেড়ে যায়। আর প্রায় প্রতিটি ভ্রম্মান্যেই বেশ কয়েকটি প্রতিরূপের সম্ভাবনাতো আছেই। সেটি আকাশ,সূর্য, চাঁদ কিংবা আমাদের মত মানুষ যেটাই হোক না কেনো।

মনে কর আমাদের কাছে দুইটা সংখ্যা রয়েছে।এবার যদি আমরা এদেরকে চেঞ্জ করে লিখতে থাকি তাহলে দুই সংখ্যার পর পর আবার সেইম সংখ্যা অর্থাৎ পূর্বের সংখ্যাই ফিরে পাবো। আবার তিন অংকের সংখ্যার সাথে একইভাবে চেষ্টা করে দেখি? তাহলে দেখা যাবে পরপর ৬ বার আলাদা আলাদা লিখবার পরেই আবার পূর্বেকার সংখ্যাটি ফিরে আসবে।

এটাই হচ্ছে মূল তথ্য! কনফিগারেশন যতই বড় হোক না কেন যেহেতু এই ভ্রম্মান্য বিস্তার অনন্ত তাই এখানকার সকল প্রাণ তৈরীতে যে পরমাণু বা এটমের যে প্যাটার্ণে আমরা সৃষ্টি, সেই একই ধাঁচ বা প্যাটার্ণের দ্বারাই আমাদের মত কেউ বা বেশ কয়েকজন রয়েছে অন্য কোনো ভ্রম্মান্যে।

কিন্তু এটা হতে পারে আমাদের অবসারভেশনের অনেক দূরে। তাই হয়তবা আমরা তাদের কাছাকাছি যেতে পারছিনা কিংবা তাদের সেই ভিন্ন ভ্রম্মান্যের সংস্পর্শ পেতেও পারছিনা।

  • লেবেল-২

লেবেল ২ -এ এই সমান্তরাল ভ্রম্মান্য কিংবা প্যারালাল ইউনিভার্সের জন্ম দেয়া‘ ইটারনাল ইনফ্লিউশন থিউরি’-র অনুসারে,আমাদের এই মহাবিশ্বে অনেকগুলি ভ্রম্মান্য আছে আর সেই সবকটাই আলাদা আলাদা বেলুনের মত অবস্থান করছে এবং অনন্ত হবার কারণে এগুলিও সমান্তরাল হবার ধারণা করা যেতেই পারে। কিন্তু প্রতিটি অনন্ত বেলুন সদৃশ ভ্রম্মান্যই একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত। তাই এক ভ্রম্মান্যের সাথে অন্য ভ্রম্মান্যের মানুষগুলোর মিল হওয়া আপাতত আমাদের কাছে অসম্ভব।

  • লেবেল-৩

এই রহস্যময় ধারণাটির জন্ম দিয়েছে কোয়ান্টাম ফিজিক্স। ধারণা করা হয় যে, এই ভ্রম্মান্য আমাদের পৃথিবীতেই নাকি মজুদ আছে কিন্তু আমাদের কাছে সেটা বোধগম্য নয় কারণ এটি অন্য কোনো আয়নে মজুদ রয়েছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বেশ কয়েকটা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এক্সপিরিমেন্টের সাথে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ‘একটি ইলেকট্রন একই সময় একের অধিক জায়গায় মজুদ হতে পারে’।  হাইজানবার্গ ইন্সিটারনিটি প্রিন্সিপ্যাল নিজে একের অধিক স্থানে প্রিন্সিপ্যাল মজুদ হয় সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। যদি ইলেকট্রন সত্যিই এইরকম আচরণ করতে পারে তাহলে আমরা কেনো পারবোনা? আমরাও তো তার থেকেই এসেছি।

তার মানে আমাদের ক্ষেত্রেও একই সময়ে অন্য জায়গায় আমাদেরই  প্রতিরূপ মজুদ থাকতে পারে এবং আরো একটি আশ্চর্যকর তথ্য হলো আপনার প্রতিরূপ আপনার প্রতিটি সম্ভাবনাকে প্রতিনিয়িত সফল করে চলেছে। আপনি হয়ত সেটা জানতেই পারেননি যে আপনার আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত আপনাকে ভিন্ন ভিন্ন ভ্রম্মান্যে নিয়ে যাচ্ছে আর আপনিও সেটাকেও মৌলিক ভেবে নিচ্ছেন।

আপনি যখন পড়াশোনা করতেন, আপনার কাছে হয়ত নিজের ক্যারিয়ার বাছাইয়ের জন্যে দুটি অপশন ছিলো। ১. আপনি কি চাকরি করবেন? নাকি ২. আপনি কোন বড় খেলোয়াড় হবেন।

আপনি হয়ত পড়াশোনাকেই বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনার কাছে ছিলো দু দুটি অপশন এবং আপনার অপর সম্ভাবনাটি হয়তবা বাস্তবায়ন করেছে আপনারই অন্য একটি প্রতিরূপ। মোট কথা হচ্ছে সম্ভাবনার উপর বেশ কিছু বিষয় ডিপেন্ড করবে। তার মাঝে একটি হলো এই প্রতিরূপের ভিন্নতার কাঠামো। যেহেতু আপনাদের চিন্তা-ভাবনা প্রায় একইরকম কিন্তু সেখানে কিছুটা ফারাক কেবল এই সম্ভাবনার খাতিরেই হয়ে যায়।

  • লেবেল-৪

আচ্ছা! মনে করুন আপনি ৫ বছর টাইমট্যাবল করে নিজের পাস্ট অর্থাৎ অতীতে চলে গেলেন। সেখানে দেখতে পেলেন আপনার প্রতিরূপকে এবং কোনোভাবে আপনি তাকে মেরে ফেললেন। এরপর কি হবে? সেই ভ্রম্মান্যে আপনার প্রতিরূপ মারা যাবে কিন্তু আপনি বেঁচে থাকবেন। কারণ আপনি আপনার ভ্রম্মান্যে জীবিত। আপনার কোনো ক্ষতি হয়নি। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে আপনি এবং আপনার প্রতিরূপ আলাদা স্বত্তা কিন্তু একই পরমাণুর তৈরী।

মেডিকেল ডেমোক্রেসি প্রিন্সিপ্যালের উপর আধারিত এই সমান্তরাল ধারণা।গণিতে যেমন বিভিন্ন থিউরি প্রস্তুত করেই কাজ করা হয় তেমনি এই সমান্তরাল বিষয়টিও একটি থিউরি হিসেবেই কাজ করছে আপাদত।  

সমান্তরাল এই ভ্রম্মান্যের অস্তিত্ব আছে কি নেই সেটি খুব দ্রুতই আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে জেনে যাব বলেই আশা রাখছি। আমাদের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত কল্পনার জগতে হারিয়ে যায় যখন সম্ভাবনা গভীর সম্ভাবনার কাছাকাছি চলে যায়।

এবার একটি রহস্যময় ঘটনা জেনে নেয়া যাক। ইন্ডিয়ার উত্তরাঞ্চল শহর। এখানকার ৩৩ বছরের এক ছেলে যে কিনা শাড়ির ব্যাবসা করে। সে ১৩ই অক্টোবর,১৯৪৫ সালে সকালবেলা তার পৈতৃক বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তো সে রীতিমত বেশ খানিকটা পথ অতিক্রমের পর ক্লান্ত হয়ে কিছুটা জিড়িয়ে নেয়। এরপর আবার চলা শুরু করেন। এরপর সামনে দেখে যে কিছুটা সাদা ধোয়া, সে অবাক হয়না একদমই। কেননা পাহাড়ের রাস্তায় কিছুটা ধোয়া থাকা স্বাভাবিক, তাই সে যথারীতি না ভেবেই ধোয়াটা অতিক্রম করে।যখন ধোয়া থেকে সে বেরিয়ে আসে দেখে রাস্তাটা বেশ আলাদা। অনেককিছুই ওলট-পালোট। তো সে তার গ্রামে গিয়ে নিজের বাড়িতে নক করে দেখে অন্য মানুষ। সে খুব অবাক হয়।তারপর জানতে পারে তার পুরো পরিবার রোড একসিডেন্টে ২০ বছর আগেই মারা গিয়েছে। এবার সে ভয়ে পুলিশকে জানাতে ফিরে যায় তার শহরে এবং ফেরার পথে সেই ধোঁয়াটিকে অতিক্রম করে যায়। এরপর পুলিশ গ্রামে এলে দেখে সব স্বাভাবিক। কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি। ভেবেছে হয়তবা বানিয়ে বানিয়ে বলছে কিংবা মানসিক কোনো সমস্যা হয়েছে তার।

কিছুদিনের মাঝেই ঘটনাটি লোকাল নিউজপেপারেও চলে আসে। তাছাড়াও! ‘the women who woke up one morning with her life suddenly slightly altered’ এরূপ একটি লাইনের মাধ্যমে স্পেনের বাসিন্দা এক মহিলার ঘটনাও বিজ্ঞানীদেরকে ভাবিয়ে তুলে।

বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমাদেরকে এটা প্রায় মানতেই হয় যে এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা একা নই এবং পাশাপাশি যদি ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’ এক্সিস্ট করে তাহলে আমাদের প্রতিরূপের সংখ্যাও অনন্য নয়। এই রহস্যের কিনাড়া বিজ্ঞানীরা খুব দ্রুতই আশা করবো উন্মোচন করবে। সেই আশাই রাখছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *