পাখি শিকারকে না বলুন - হাতেখড়ি

পাখি শিকারকে না বলুন

খুরশিদ জামান কাকন:

ছোটবেলার কথা। বয়স তখন সাত কি আট হবে। ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। সামনে লম্বা এক ছুটি। আর এই ছুটিটাকে ঘিরেই ছিলো অনেক পরিকল্পনা। এরমধ্যে বাটুল বানিয়ে পাখি শিকার করা ছিলো অন্যতম। বলা চলে এটাই তখন আমাদের প্রধান কাজ। স্বভাবতই বাড়ির ছোটদের খুব বেশি বাইরে যেতে দেওয়া হতো না। বাটুল বানানোর যাবতীয় সরঞ্জাম একার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হতো না। তাই পাখি শিকারের এই অস্ত্র বানানোর জন্য বড়দের উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। এজন্য বড়দের কাছে সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করতাম। বাটুল বানিয়ে দেওয়ার জন্য বাইনা ধরতাম।

শীতকালের এই সময়টাতে ক্ষেতের পর ক্ষেত ছিলো শুকনো। মাঠঘাটও ফেটে রুক্ষ। বেলা বাড়লেও কুয়াশা থাকতো। কোন কোন দিন তো সূর্যেরও দেখা মিলতো না। তাই বাড়ি থেকে বের হওয়া খুব একটা সহজ ছিলো না। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। সদর দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকতাম। একটু সুযোগ পাওয়া মাত্রই চুপ করে বেরিয়ে পড়তাম। বন্ধুরা সবাই বাটুল নিয়ে একত্রিত হতাম। তারপর মাঠের পর মাঠ চষে বেড়াইতাম। ছোটবড় বিভিন্ন পাখি শিকারের আশায় এদিকওদিক ঘুরতাম। জঙ্গল, বাঁশঝাড়, দিঘি আর খালবিলে দেখা মিলতো নানান প্রজাতির পাখি। তবে সবচেয়ে বেশি দেখা মিলতো বিভিন্ন প্রজাতির বক। কুয়াশাকে কাজে লাগিয়ে সবাই বক শিকারে ব্যস্ত থাকতো। তবে আমার পক্ষে কোন পাখি শিকার করা সম্ভব হয়নি। হাতের নিশানা খুব বাজে ছিলো। তাই আমার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বৃথা ছিলো। এ নিয়ে বন্ধুমহলে এখনো হাসিঠাট্টার সীমা নেই।

এতো গেলো ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতিকথা। ধীরেধীরে বড় হতে লাগলাম। জ্ঞান বুদ্ধিও বাড়তে শুরু করলো। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির যে অপরিহার্য অবদান তা উপলদ্ধি করলাম। প্রকৃতিতে সাড়া জাগানো পাখির উপকারিতা সম্পর্কে বিশদ ধারনা পেলাম। মিষ্টি সকালে পাখির কলকাকলি কতোই না মধুর লাগে। মুক্ত আকাশে পাখির অবাধ বিচরণ দেখতে কার না ভালো লাগে। দৃষ্টিনন্দন পাখির অপরূপ সৌন্দর্য খুব সহজেই যে কারো মন উতলা করে দেয়। তাই পাখিকে ঘিরে একটা অন্যরকম ভালোলাগা জন্মায়।

এখন আমি না বুঝে করা অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত, সেই সাথে অনেক সচেতনও বটে। আজ আমিও পাখি রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টি করার একজন উদ্দ্যোক্তা। ‘সেতুবন্ধন’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে এখন আমরা দলবদ্ধভাবে পাখি রক্ষার চেষ্টা চালাই। পাখির সুরক্ষা নিশ্চিতে গাছে গাছে কলস লাগাই। সেই সাথে স্কুলে স্কুলে ক্যাম্পিং করে পাখি রক্ষায় সচেতনতা বাড়াই। পাড়া মহল্লায় উঠান বৈঠক করে পাখি শিকারিদের প্রতিহত করার আহবান জানাই।

আজ আমি গর্বের সাথে বলতেই পারি আমার গ্রামে কেউ পাখি শিকার করে না। এলাকার তরুন সমাজ বহিরাগত শিকারিদেরও গ্রামে ঢুকতে দেয়না। এমনকি এলাকার শিশুকিশোররাও আর আগের মতো বাটুল বানায় না। সবার মধ্যেই এখন সচেতনতাবোধ তৈরি হয়েছে। আর পাখির প্রতি অকৃত্তিম ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে। যা ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশের গ্রামগুলোতেও। যদি একজন মানুষ বদলালে বদলে যায় একটি এলাকার চেহারা। তাহলে ১০ জন মানুষ বদলালে বদলে যাবে ১০ টি এলাকার চেহারা। তাই আসুন সকলে পাখি ও প্রকৃতি সুরক্ষায় হাতেহাত রাখি। পাখি শিকারকে না বলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *