গ্যালিলিওর কারণে যে বইটিকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল - হাতেখড়ি

গ্যালিলিওর কারণে যে বইটিকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল

তাবাচ্ছুম ফাইজা:

বিজ্ঞান কি এই প্রশ্ন করা হলে আমরা বরাবরই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই৷ তারপর মুখ গম্ভীর করে বলি “প্রকৃতিকে জানার যে জ্ঞান তা-ই বিজ্ঞান”। সত্যি করে বলতো, এত কঠিন সংজ্ঞায়ন এ যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? তুমি কত জোরে ব্যাট চালালে বল বাউন্ডারির ওপারে যাবে এটাতো প্র‍্যাক্টিস আর কমনসেন্স দিয়েই বোঝা যায়। এটাতে বিজ্ঞান আসল কোত্থেকে?

এসো সংজ্ঞায়ন চেঞ্জ করে সহজ করে দেই। বিজ্ঞান হচ্ছে সত্য। বিজ্ঞানে মিথ্যার কোনো জায়গা নেই৷ বিশেষ+জ্ঞান যা সত্য তা-ই বিজ্ঞান। আর সেটা কিন্তু শুধুই জ্ঞান কেননা বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রযুক্তি আমাদের ক্ষতি করতে পারলেও কোনো সত্য জ্ঞান কখনো আমাদের ক্ষতি করতে পারে না। কারণ জ্ঞান হচ্ছে জানা, আর কোনো কিছু জানা কখনো খারাপ হয় না যতক্ষণ সেটা ব্যবহার খারাপভাবে না করা হয়। যেমন ধরো ছুরি দিয়ে আপেল কাটা যায় আবার কাউকে আঘাত ও করা যায়। তুমি দুটোই জানো, জানাটা দোষের না। কিন্তু তুমি যদি প্রথমটা ব্যবহার না করে দ্বিতীয়টা করো তবে সেটা খারাপ। কাজেই আমরা জানলাম বিজ্ঞান আসলে খারাপ না, খারাপ হতে গেলে প্রযুক্তি ( বিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিক) বা মানুষের মানসিকতা খারাপ হতে পারে৷ কাজেই আজ অব্ধি যারা যারা ” বিজ্ঞান আমাদের দেয়ার চেয়ে বেশি কেড়ে নিয়েছে” মনে করে এসেছ, ধারণা পালটে ফেল এক্ষুনি!

আজকে তোমাদের বিজ্ঞানের একটা ব্যথিত কাহিনী শোনাব।

গ্যালিলিও গ্যালিলির নাম শুনেছ? এই মহান বিজ্ঞানীর জন্ম ১৫৫৮ সালে ও মৃত্যু ১৬৪২ সালে। এই মানুষটাই প্রথম বলেন যে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহ ঘুরছে। আসলে ইনি নন, প্রথম বলেন কোপার্নিকাস নামক একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু তখন ক্যাথলিক চার্চ নামক যে ধর্ম ছিল সেটি এই তত্ত্বকে সমর্থন করতো না। পাশাপাশি বিখ্যাত দার্শনিক টলেমির ছিলো তখন অনেক নাম ডাক। তিনি মনে করতেন পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সবাই ঘুরছে। তার মতের বিরুদ্ধে কথা বলা তখন ছিলো দণ্ডনীয় অপরাধ।

কোপার্নিকাস ১৬৩০ সালে প্রথম টলেমির এই মতবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একটি বই লেখেন। সে-ই বই প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে যখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। বইটির প্রকাশক কোপার্নিকাসের অনুমতি ব্যতিত-ই বইটিতে লিখে দিয়েছিলেন যে উক্ত বইয়ে যা লিখা হয়েছে সব কাল্পনিক। সমস্যার সমাধানের জন্য আরেকটা সহজ উপায় কল্পনা করা ব্যতীত এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই!

গ্যালিলিওর কারণে বইটি কোপার্নিকাসের মৃত্যুর ৭৩ বছর পর সবার নজরে আসে এবং ১৬১৬ সালে ক্যাথলিক চার্চ ‘ডায়ালগ কন্সার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ডস সিস্টেম’ বইটিকে নিষিদ্ধ করে দেয়। এরপর গ্যালিলিও নিজে একটি বই লেখেন যাতে তিনজন মানুষের মধ্যকার কথোপকথন তুলে ধরা হয়। যাদের একজন কোপার্নিকাসের মতবাদে বিশ্বাসী, একজন টলেমির এবং অন্যজন নিরপেক্ষ। বইটিতে দেখানো হয় টলেমির মতবাদ বারবার কোপার্নিকাসের মতবাদের কাছে হাস্যকরভাবে ভুল প্রমাণিত হয়। বইটি গ্যালিলিও অনেক ভয়ে ভয়ে প্রকাশ করেন অনেকদিন পর তার এক পুরোনো বন্ধু পোপ হলে। স্পষ্টতই ক্যাথলিক চার্চ এটিকে ভালোভাবে নেয়নি। না নেয়ারই কথা কেননা জিওর্দানো ব্রুনো নামক একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় টলেমির বিশ্বাস কে সমর্থন না করার জন্যই এবং এই নৃশংস কাজটি ক্যাথলিক চার্চ ই করে। ব্রুনোকে মৃত্যুর আগে তিনি ভয় পাচ্ছেন কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন তার ধারণা ক্যাথলিক চার্চ ই বেশি ভয় পাচ্ছে সত্যিটা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার চিন্তায়!  যাহোক তারা গ্যালিলিওর বইটিকে নিষিদ্ধ করে দেয় এবং নানা কাহিনীর পর গ্যালিলিও কে ডেকে এনে ১৬৩৩ সালে আটক করা হয়। তাকে টর্চার সেলে রেখে বহুদিন নির্যাতন করা হয় এবং অঙ্গীকারনামা পড়ানো হয়। গ্যালিলিও বলেন “আমি আমার পিতা স্বর্গীয় ভিঞ্জেচিও গ্যালিলির পুত্র গ্যালিলিও গ্যালিলি এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে আমি যা মনে করি সব মিথ্যা এবং ক্যাথলিক চার্চ আমার পবিত্র ধর্ম। এতে যা বলা হয়েছে আমি তার বিরুদ্ধে আর কিছু বলবো না।”

বলাই বাহুল্য নির্যাতিত অবস্থায়ই গ্যালিলিও মারা যান এবং এই মহান বিজ্ঞানীকে দাফন ও খুব অবহেলায় করা হয়। গ্যালিলিও কে পরবর্তী সময়ে ক্যাথলিক চার্চ ক্ষমা করে দিলেও জিওর্দানো ব্রুনোকে কিন্তু এখনো করেনি।

শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে সত্যের উপর এত বড় অনাচারের দৃষ্টান্ত কিন্তু যে তখন-ই কেবল ছিল তা-না! এখনকার তথাকথিত স্বাধীন পৃথিবীতেও আছে। আমাদের চারপাশেই আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *