গল্প । ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধার দল - হাতেখড়ি

গল্প । ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধার দল

মো. রেজাউল করিম:

মিলন, বদর আর আকলিমা প্রতিদিন তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যায়। ওদের গ্রামে কোনো স্কুল নাই কি-না! পাশের গ্রাম আলমপুরে স্কুল রয়েছে। ওখানেই ওরা পড়তে যায়। স্কুলের নাম ‘আলমপুর আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। প্রতিদিন তিন আর তিন ছয় কিলোমিটার স্কুলে হেঁটে যাওয়া-আসা করা কত না কষ্ট। গরমের সময় বই-হাতে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়া-আসা আরও কষ্ট। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। বৃষ্টির দিনে কখনো সখনো স্কুলে যাওয়াই হয় না। বাবা-চাচারা না-কি আরও অনেক বেশি কষ্ট করে লেখাপড়া করতেন।

তখন আগস্ট মাস। বাবা-চাচা-দাদা এমনকি মা-খালারাও আজকাল যুদ্ধের কথা বলেন। তাদের গ্রামে যুদ্ধ নেই। কিন্তু দেশে নাকি যুদ্ধ হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করছে। মিলন, বদর আর আকলিমা স্কুলে যাওয়ার সময় এগুলো নিয়ে গল্প করে। গ্রামের দু’জন বড়ো মানুষ নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করছে। ওনারা কখনও গ্রামে আসেন না। আর ওদের গ্রামে কখনও যুদ্ধও হয়নি। যে কারণে যুদ্ধ কেমন তা ওরা জানে না।

ওদের খুব শখ মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা। কিন্তু দেখবে কিভাবে? তারা তো রাইফেল-মেশিনগান নিয়ে যুদ্ধ করছে। ওরা তিনজনই তো ছোটো। যুদ্ধ যেখানে হচ্ছে সেখানে গিয়ে কী আর মুক্তিযোদ্ধা দেখা যায়?

সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পরে ভাত খাওয়ার সময় মায়ের কাছ থেকে শুনল, ওদের গ্রামে নাকি বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসেছেন। তাঁরা কয়েকদিন এখানে থাকবেন। গ্রামের যে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন তাঁরাও এসেছেন। এখান থেকে নাকি কোথায় অপারেশনে যাবেন তাঁরা।
‘অপারেশন কী মা?’, মিলন মাকে জিগ্যেস করল।

‘অপারেশন মানে হচ্ছে এখান থেকে গিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর আক্রমন করবে।’
ভাত খাওয়া শেষ হওয়ার পরে মিলন আর অপেক্ষা করতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে বদর আর আকলিমাকে জানাল কথাটা। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার জন্য তাদের ব্যাকুলতা আরও বেড়ে গেল।

তিনজনে একত্রে মিলনের মায়ের কাছে এসে বলল তাদের মনের কথা। তিনি বললেন, ‘তারা কোথায় আছে আমি জানি না। বিকেলে তোমার বাবা আসলে বলে দেখ। তিনি জানতেও পারেন।’

এর পরেও ওদের একের পর এক প্রশ্নে মিলনের মা বেশ বিরক্ত হলেন। বিরক্ত হবেন না-ই বা কেনো? ওদের প্রশ্নের তো শেষ নেই। ‘তাঁরা দেখতে কেমন? তাঁদের বড়ো চুল আর দাড়ি আছে কিনা? তাঁরা কি সবসময় রাইফেল হাতে নিয়ে থাকে? তাঁরা কি খুব রাগী?’ আরও কত প্রশ্ন।

মিলনের বাবা আসলেন সন্ধায়। মিলন তখনই কিছু জিগ্যেস করল না। সে জানে বাবা এখন ক্লান্ত। পড়াশোন শেষে কাকার কাছে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার কথা বলল। বাবা তখন রেডিওতে কী যেন শুনছিলেন। তিনি বললেন, ‘বাবা মিলন, এখন আমি ‘চরমপত্র’ শুনছি। এখন কথা বোলো না।’
মিলন হতাশ হয়ে নিজের ঘরে চলে এল। হারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিয়ে ‘গোপাল ভাঁড়’ এর গল্পের বই পড়া শুরু করল।

খাবার সময়ে ভয়ে ভয়ে বাবাকে আবার জিগ্যেস করল, ‘বাবা চরমপত্র কী?’
বাবা বললেন, ‘চরমপত্র? আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বেতার কেন্দ্র বা রেডিও সেন্টার রয়েছে। ওখানে চরমপত্র নামে একটা অনুষ্ঠানে যুদ্ধের খবরাখবর প্রচারিত হয়।’

বাবাকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার কথা বললে তিনি বললেন, ‘আমিও তো তাদেরকে দেখিনি। তারা তো দিনের বেলায় সাধারণত ঘুমায়। রাতের বেলায় কোথায় যায় যুদ্ধ করতে কেমন করে বলব। দেশে এখন রাজাকার বাহিনীও হয়েছে। তারা যদি জানে যে এই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আছে তাহলে পাকিস্তানী বাহিনীকে বলে দিবে। যে কারণে তারা অনেকটা লুকিয়েই থাকে।’

‘রাজাকার কী বাবা’, জিগ্যেস করল মিলন।
এদেশেরই কিছু যুবক পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে রাজাকার নামে একটা বাহিনী গড়ে তুলেছে। ওরা বাঙালী। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে মিলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধও করছে।

পরদিন মিলন স্কুলে যাবার সময়ে আকলিমা ও বদরকে হতাশার কথা বলল। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা যাবে নাÑ এটা জেনে ওরাও মনে দুঃখ পেল।
গ্রাম পার হয়ে কিছুটা এগোতেই নতুন কাঠের সাঁকোতে ওরা খাঁকি পোশাক পরা তিনজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তিনজনের হাতেই পুরনো বন্দুক। ভয়ে ওরা সাঁকোতে না উঠে সাঁকোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকল। ওদের একজন এগিয়ে এসে মিলনদেরকে বাড়িতে চলে যেতে বলল। আকলিমা বলল, ‘তাহলে যে আমরা স্কুলে অ্যাবসেন্ট হয়ে যাব।’

মিলন আর বদরও ততক্ষনে ওদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মিলন শুনতে পেল ওদের একজন বলছে, ‘ওরা বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ওদেরকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যেত বল্। একটু পরেই পাকিস্তানী মিলিটারি চলে আসবে।’

কথাটা কানে আসতেই মিলন বুঝে ফেলল, ওদের গ্রামে যে মুক্তিযোদ্ধারা আছে তা রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানীদেরকে বলে দিয়েছে। সেকারণেই হয়ত পাকিস্তানী মিলিটারি ওদের গ্রামে আসছে। মিলন ‘জি আচ্ছা, জি আচ্ছা’ বলে দ্রুত ওখান থেকে সরে এল। এর পরে তিনজনে মিলে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামে এসে সোজার বাবার দোকানে চলে গেল। বাবাকে সব ঘটনা খুলে বলল। মিলনের বাবা সব বুঝতে পারলেন। তিনি সাথে সাথে দোকান বন্ধ করে বাজারের আর এক দোকনে গিয়ে কাকে যেন খবরটা দিলেন। মিলনরা পেছনে পেছনে গিয়ে হাজির।

কিছুক্ষনের মধ্যেই ওরা অদ্ভুত চেহারার পঁচ-ছয় জন লোককে বাজারে ঢুকতে দেখল। ওনাদের পরনে ঢোলা ফুল প্যান্ট আর অদ্ভুত ডিজাইনের জামা। মাথায় রয়েছে লোহার হেলমেট, হাতে রাইফেল। একজনের হাতে রাইফেলের চেয়েও লম্বা কী একটা অস্ত্র। মিলনদের বুঝতে বাকি থাকল না যে, ইনারাই মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা মিলনদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে গ্রামের আরও কয়েকজন লোককে নিল। মাটির রাস্তার পাশ দিয়ে ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সাঁকোর দিকে এগিয়ে চললেন তাঁরা।

সবার অলক্ষ্যে মিলন, বদর, আকলিমাও হামাগুড়ি দিয়ে সাঁকোর দিকে এগিয়ে চলল। কী হয় তা দেখার জন্য সাঁকোর বেশ কিছুটা দূরে একটা গর্তের মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে থাকল।

ওরা দেখল মুক্তিযোদ্ধারা হঠাৎ রাজাকারদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদেরকে শুইয়ে ফেলল। ওদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বেশ মারধোর করা হলো। এরপরে ওদের অস্ত্র থেকে গুলি বের করে নিয়ে সাঁকোর সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। ওদেরকে বলা হলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে, নাহলে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। রাজাকারগুলো মার খেয়ে সাঁকোর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকল। দু’জন মুক্তিযোদ্ধা নৌকায় করে গিয়ে সাঁকোর তলায় বোমা মতো কী যেন বেঁধে সেটার সাথে লাগানো তার টানতে টানতে পাশের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেল।

এর পরে কোথাও কোনো শব্দ নেই। সুনসান নিরাবতা। মিলনরা বেশ ভয় পেয়ে গেল। ওরা ভাবছিল কি হবে এর পরে? বাবাদেরকে না বলে এখানে আসাটা বোধ হয় ঠিক হয়নি। যদি যুদ্ধ হয়! যদি ওদের গায়ে গুলি লাগে কী হবে তখন? ওরা যে গর্তের মধ্যে আছে তা-ও তো কেউ জানে না।
কিছুক্ষন পরে ওরা গাড়ির শব্দ শুনতে পেল। গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ভয়ঙ্কর কিছু একটা হবে বলে মনে হলো মিলনের। এক নিমিষের জন্য মিলন মাথাটা একটু উঁচু করে দেখল জলপাই রঙের একটা জিপ আর একটা পিক-আপ ভ্যান এগিয়ে আসছে। পেছনের গাড়িতে অনেক সৈন্য। সবার হাতে রাইফেল। মিলন সাথে সাথে মাথাটা নামিয়ে নিল গর্তের মধ্যে।

বোধ হয় কয়েক মুহূর্ত পার হয়েছে। প্রচন্ড শব্দে মিলনদের গর্তের মাটি পর্যন্ত কেঁপে উঠল।
এদিকে সাঁকোর নিচে মুক্তিযোদ্ধারা বোমা বেঁধে রেখেছিল। গাড়ি সাঁকোতে ওঠা মাত্রই বোমার সাথে বাঁধা তারে একটার সাথে আর একটা জুড়ে দেয়া হয়েছে। তার জুড়ে দেয়ার ফলে বোমা ফেটে সাঁকো ভেঙে গাড়ি সহ হুড়মুড় করে নিচে খালের মধ্যে পড়ে গেছে। সাথে সাথেই মুক্তিযোদ্ধারা পানির মধ্যে পড়ে যাওয়া গাড়ি লক্ষ্য করে অবিরাম গুলি করতে থাকে।

বোমা ফাটার শব্দ, গুলির শব্দ, মানুষের চিৎকার সব মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। মিলনরা সকলেই খুব ভয় পেয়ে যায়। বদর তো থরথর করে কাঁপতে থাকে।

কিছুক্ষনের মধ্যেই সকল পাকিস্তানী সেনা মারা যায়। রাজাকাররা অস্ত্র ফেলে কোথায় যে পালিয়ে গেল, পরে খুঁজেও আর পাওয়া যায়নি ওদেরকে। এরও কিছুক্ষন পরে গ্রাম থেকে শত শত মানুষ লাঠি, ছুরি, দাও- যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে ছুটে আসতে লাগল।

মিলনারা তখন সকলের অগোচরে বাড়ির দিকে রওনা দিল। গ্রামের সকলেই মিলন, আকলিমা ও বদরের ঘটনা জানল। গ্রামে সেদিন থেকে ওদের নাম হয়ে গেল ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *