কুঁজো বিলের ভূত - হাতেখড়ি

কুঁজো বিলের ভূত

সাইফুল ইসলাম লাবিদ:
স্কুল বন্ধ এক সপ্তাহের জন্যে, পরীক্ষার পড়া পড়তে পড়তে একেবারে পানসে হয়ে গেছি, যাক বাবা এই কটা দিন অন্তত একটু শান্তিতে থাকা যাবে, পড়াশোনা তেমন করতে হবে না। এই পূজোর ছুটি’টার জন্যে আমি অনেকদিন থেকেই অপেক্ষা করছিলাম, কবে পূজো আসবে, কবে স্কুল বন্ধ হবে।
হেরে রবিন, এবার পূজো দেখতে কোথায় যাবি?
কিছুক্ষণ চুপ করে উত্তর দিল রবিন, “কোথায় আর যাবো, দুর্গাবাড়ী ছাড়া যাবার কি আর কোথও জায়গায় আছে?”
না তাও ঠিক বলেছিস, দুর্গাবাড়ী ছাড়া আর যাবার ও তেমন কোনো জায়গা নেই। কিন্তু দুর্গাবাড়ী আমাদের এই মোহনপুর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে, সাইকেলে করে যেতে হবে, পথঘাটও তেমন ভালো নয়।
রবিন বলল, “মহিন তুই একটা কথা ভেবেছিস?”
 দুর্গাবাড়ীর পূজোয় গেলে কুঁজো বিল পার হয়ে যেতে হবে,
আর কুঁজো বিলের কাহিনী তো তুই সবই জানিস। গত পূজোয় মল্লিক বাড়ির জগেন  কাকার সাথে কুঁজো বিলে যেগুলো ঘটেছিলো সেসব যদি আমাদের সাথে ও ঘটে?
মহিন বলল, “দেত তুই যে কি বলিস, আজকাল ওই সব ভূত টুত আছে নাকি আবার? এসব মানুষের মুখের গল্প মাত্র, আমি ঐসব ভূত টুত বিশ্বাস করি না, আর ভয়ও পায়না।”
রবিন বিরক্তিকর গলায় বললো,” তোর তো যতসব মুখে বড় বড় কথা কাজে-কর্মে কিছুই নেই।”
রবিন দেখ, আমাদেরকে পূজো দেখতে যেতেই হবে, এবং দুর্গাবাড়ীতেই যাবো। তুই ওইসব কুঁজো বিলের চিন্তা টিন্তা মাথায় রাখিস না। শুনেছি দুর্গাবাড়ীর পূজোয় নাকি এবার অনেক বড় এক গানের দল বায়না করেছে, খুব নাচাগানা হবে। তুই ই বল এসব কি  আমরা মিছ করতে পারি? আমাদেরকে যেতেই হবে, তুই অমত করিস না ভাই।
একাধারে এত কথা বলার পরেও রবিনকে চুপ করে থাকতে দেখে মহিন বললো, আরে ব্যাটা ভূত বলতে কিছুই নেই। আচ্ছা তুই কি কখনও নিজের চোখে ভূত দেখেছিস?
মাথা নিচু করে উত্তর দিল রবিন, না দেখিনি।
তাহলে এগুলো বিশ্বাস করছিস কেন? সবই হচ্ছে আমাদের মনের ভুল ধারণা মাত্র আর কিছুই না বুঝলি।
 তাহলে কাল আমরা দুর্গাবাড়ী যাচ্ছি, বেলা থাকতে থাকতেই আমাদেরকে রওনা দিতে হবে, শুনেছি সন্ধ্যার পরপরই নাকি গানের আসর বসে যাবে।
এখন উঠি রে, অনেক দেরি হয়ে গেছে, তোর এখানে আসবো মাকে বলে আসি নাই।বাড়িতে গেলে নিশ্চয়ই মায়ের বকা খেতে হবে।
আমি কাল সময় মতো চলে আসবো, তুই তৈরি হয়ে থাকিস।
রবিন নীরব ভাষায় বলল, আচ্ছা থাকবো।
 ওরা দুজনেই খুব ভালো বন্ধু , স্কুলে  একি ক্লাসে পড়ে, সামনেই সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা,তাই ওদের পড়াশোনার ব্যস্ততা একটু বেশিই। রবিন কখনো স্কুল ফাঁকি দেয় না,তবে মহিন মাঝে মাঝে দেয়, আবার কখনো কখনো ওর বাবার পকেট থেকে টাকাও চুরি করে। একবার রবিন জিজ্ঞেস করেছিলো, তোর বাবার পকেট থেকে টাকা কেন চুরি করিস?
উত্তরে মহিন বলেছিল, বাবা কা হালকা কারদিয়া, মানে? মানে হচ্ছে টাকা পয়সা থাকলে মানুষ বেশি টেনসনে থাকে, এই ভেবে যে কখন যেন তার টাকা হারিয়ে যায় কিংবা চুরি হয়ে যাই। তাই মাঝেমধ্যে বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়ে বাবাকে হালকা করে দিই।
মহিনের এরকম অভ্যাস থাকলেও রবিনের কিন্তু একদম’ই নেই। তবে ওরা দুজনেই বেশ ভালো ছেলে। পরোপকারীও বটে।
একবার ওদের এলাকার রহিম নামের এক লোকের ছেলের কঠিন অসুখ হয়েছিল, কলেরা, পাড়া প্রতিবেশী সবাই ওদের বাড়ি যাওয়া আসা বন্ধ করে দিয়েছিলো। কলেরায় পড়ে রহিমের ছেলের একেবারে যায় যায় অবস্থা, বেচারা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না,তখন মহিন আর রবিন দুজনে সারা গ্রাম খুঁজে একটা ঠেলা যোগার করে, সেই ঠেলায় করে রহিমের ছেলেকে সদরের হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এসেছিল। এরকম পরোপকারীতা ওরা হরহামেশাই করে থাকে।
পরদিন বিকেলে সাইকেলে করে ওরা দুজন রওনা দিল দুর্গাবাড়ীর উদ্দেশ্যে, গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে কুঁজো বিল পেরিয়ে গোধূলিলগ্নে গিয়ে ওরা পৌঁছালো দুর্গাবাড়ীর পূজা মন্ডপে।
দুর্গা বাড়ির বটতলায় বসেছে দেবী দূর্গার মূর্তি, চারদিকে জ্বলছে নানা রঙের ঝলমলে আলো। মহিলারা শাড়ি আর ছেলে বুড়োরা ধুতি পাঞ্জাবি পরেছে।  চারদিক থেকে ঢাক ঢোলের আওয়াজ ভেসে আসছে।
দেবী দূর্গার আগমনে যেন ব্যাস্ত সময় পার করছে সবাই। বটবৃক্ষের তলায় দেবী দূর্গার মূর্তির  নিচে আসন পাতা হয়েছে, সেই আসনে বসে আছে গেরুয়া পোশাক পরা এক লোক। হাতে তার একতারা কাদে ডুগি, ডুক ডুক শব্দ ভেসে আসছে, দেবী দূর্গার আগমনে গলা ছেড়ে গান ধরেছে গেরুয়া পোশাক পরা সেই বাউল ও তার সারগেত রা।
মন খুলে গাইছে দূর্গা মা এলো রে, জয় মা এলো রে।
তারি সাথে নাচ্ছে ছেলে, বুড়ো, কিশোর কিশোরী সবাই, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই এক সারিতে নেই কোন ভেদাভেদ নেই কোন প্রতি হিংসা। এসব দেখতে দেখতে গভীর রাত হয়ে গেলো মহিন আর রবিনের।
রবিন বলল মহিন, এবার আমাদের বাড়ী ফেরার দরকার, অনেক রাত হয়ে গেছে। ওরা তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিল। গ্রামের রাস্তা, চারদিক অন্ধকার কোথাও কোনো আলো নেই, এতটাই ঘোর অন্ধকার যে নিজেকেও খুভ ভালো করে দেখা যায় না। এই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাবার কোনো উপায় নেই।
বাধ্য হয়েই অন্ধকার জনশূন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটছে মহিন আর রবিন। দূরে শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে, শেয়ালের ডাক এই অন্ধকার অস্বাভাবিক পরিবেশটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। রবিন বলল, মহিন একটা বিষয় খেয়াল করেছিস? আজকে রাস্তায় একটা লোকও নেই, এমনকি আজকের চাঁদ ওঠেনি, আমার খুব ভয় করছে।
মহিন হাঁসির ভঙ্গিতে বলল, রাস্তায় লোক নেই তো কি হয়েছে, এতে ভয় পাবার কি আছে। আমরা একটু আগেই চলে আসছি,  হয়তোবা আমাদের পেছনেই লোকজন আসছে।
রবিন বলল না মহিন, তুই বিষয়টা বুঝতে পারছিস না, আজকের অন্ধকারের সাথে অন্য দিনের অন্ধকারের অনেক পার্থক্য।  আমি এর আগে এরকম অন্ধকার কখনো দেখিনি।
সামনে একটা বাঁশবাগান পড়বে, একটু সাবধানে পথ চলবি ভাই। বড়দের মুখে শুনেছি, রাতের বেলা এরকম জনশূন্য রাস্তায় কেউ ডাকলে, পেছনে ফিরে তাকাতে নেই, আমি তাকাবো না, তুইও তাকাস না।
মহিন বললো, তুই খামোখাই ভয় পাচ্ছিস, আমাদের সাথে এরকম কিছুই হবে না। বাঁশবন  পেড়িয়ে ওরা এখন কাজলা দিঘি গ্রামের রাস্তায়, এর পরের গ্রামটাই ওদের।
স্বাভাবিক এর তুলনায় রবিন একটু বেশিই ভীতু টাইপের লোক, তাই ও খামোখাই ভয় পাচ্ছে।
তবে রবিনের আজকের ভয়ের  যথেষ্ট কারণ আছে, অন্যদিনের তুলনায় আজকের রাতটা একটু বেশিই অন্ধকার, কেমন জানি গা ছমছমে ব্যাপার। এ সময় এই রাস্তায় লোক থাকার কথা, কিন্তু আজকে একটা লোকও নেই।
এইসব বিষয় রবিন এর কাছে ভয়ের কারণ মনে হলেও, মহিনের কাছে কিন্তু সব স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে।
রবিন যেটাকে ভয় পাচ্ছে, মহিন সেটাকে যুক্তি দিয়ে খন্ডানোর চেষ্টা করছে, অনেকটাই মিসির আলি সাহেবের মত। অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেও একটা যুক্তি দাঁড় করিয়ে সেটাকে স্বাভাবিক করে ফেলা, যেন কিছুই হয়নি।
কাজলা দিঘি পেরিয়ে ওরা এখন মোহনপুরের খুব কাছাকাছি, সামনেই কুঁজো বিল, এর পরেই ওদের বাড়ী।
মহিন বললো আচ্ছা রবিন, এই বিল’টার নাম কুঁজো বিল কেনরে তুই কি কিছু জানিস?
রবিন বলল দাদিমার মুখে শুনেছিলাম, আজ থেকে প্রায় অনেকদিন আগে এই গ্রামে এক বুড়ি থাকতো, কুঁজো হয়ে  হাটতো বলে সবাই ওনাকে কুঁজো বুড়ি বলে ডাকত।
এমনই এক দূর্গাপূজোর সময়,গায়ের সবার সাথে বুড়িও গেল পূজো দেখতে।
আসার সময় আচমকা ঝড় শুরু হয়, সবাই দৌড়ে যে যার মতো বাড়ি চলে আসে। বুড়ির কথা তখন কারো মনে ছিল না, পরদিন ভোরে রাখাল বিলের পাশ দিয়ে মাঠে গরু নিয়ে যাচ্ছিল, তখন বুড়ি কে রাস্তার পাশে মরে পড়ে থাকতে দেখে।  বুড়ি কিভাবে মারা গেল আজ পর্যন্ত এর সঠিক কারণ কেউই জানতে পারেনি।
 তবে অনেকেই মনে করেন যে, ঝড়ের সময় যখন সবাই বাড়ী চলে আসে বুড়ি আসতে পারেনি, ঝড়ের কবলে পরেই বুড়ির এর মৃত্যু হয়েছে। পরে নাকি অনেকেই রাতের আঁধারে বিলের এই রাস্তায় কুঁজো বুড়িকে চলাচল করতে দেখেছে। ওই ঘটনার পর থেকেই নাকি বিল’টার তার নাম হয়ে যায় কুঁজো বিল।
গল্প করতে করতে ওরা এখন কুঁজো বিলের রাস্তায়, হঠাৎ দুজনেই কথা বন্ধকরে করে দিল,  কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছে না, একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানতালে হেঁটে যাচ্ছে দুজনেই।
মহিন মনে মনে ভাবছে,  রবিন হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিলো কেন?  তাহলে কি ও ভয় পাচ্ছে?
মহিন বলল, কিরে রবিন কি হয়েছে? কোন কথা বলছিস না কেন?
 মহিনের কথার কোন উত্তর না দিয়েই আরো দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগলো রবিন।
 রবিনের এরকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ওর পেছন পেছন দৌড়াতে থাকে মহিন,
 কিন্তু কোন ভাবেই ধরতে পারছিলনা ওকে।
 মহিন যতই সামনের দিকে এগুচ্ছে রবিন যেন দ্রুত আরো দূরেই চলে যাচ্ছে।
পেছন থেকে রবিন বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে লাগলো মহিন। হঠাৎ মহিন একটা বিষয় খেয়াল করলো যে,
 রবিন যতই দূরে যাচ্ছে তার আকৃতি যেন আরো ততই বড় হচ্ছে, বিষয়টা তার কাছে অস্বাভাবিক লাগে, দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়ে মহিন।
 রবিন এখন অনেক দূরে,তবে দূরে হলেও যেন খুব কাছে, কারণ রবিনের আকৃতি এখন এতটাই বড় যে, যেন আকাশ ছোঁয়া। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তবে এই অন্ধকারের মধ্যে আর কিছু দেখা না গেলেও দূর থেকে রবিনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ একটা ঝাপটা বাতাস এল, আর দোয়ার মত বাতাসে মিলিয়ে গেল রবিন।
মহিন ভয় পেতে শুরু করল,গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে এসব, আর কেনইবা হচ্ছে?
মহিন তার চোখের সামনে নানা রঙের আলো দেখতে শুরু করলো, মাথাটা কেমন জানি ঝিম ঝিম করছে, একসময় ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।
চোখ খুলে মহিন নিজেকে আবিষ্কার করলো যে, সে তার বাড়ির উঠোনে  চাটাই এর উপর শুয়ে আছে। চারদিকে অনেক লোক ভিড় করেছে, মা কাঁদছে, রবিন কেউ দেখা যাচ্ছে।
রবিন বললো, কিরে মহিন কি হয়েছিল তোর,কুঁজো বিলের ধারে তুই কখন  গিয়েছিলি? ভোর বেলা লোকজন তোকে বিলের ধারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসে।
মহিন তো অবাক, রবিন এসব কি বলছে?
মহিন বললো, তুই আর আমিই তো কাল দুর্গাবাড়ীতে পূজো দেখতে গিয়েছিলাম।
তারপর তুই কুঁজো বিলের ধারে আমাকে একা রেখে চলে আসলি কেন?
রবিন বলল কি বলছিস? আমি তো কাল বাড়িতেই ছিলাম না, হঠাৎ মাধবপুর থেকে আমার ফুফুমা এর অসুস্থতার খবর আসে, তাকে দেখতেই তো আমি মাধবপুর গিয়েছিলাম। অবশ্য যাবার সময় ভেবেছিলাম, তোকে একবার বলে যাবো, কিন্তু সময়ের জন্য বলে যেতে পারি নাই।
মহিন আর কিছুই বলার সাহস পেলো না, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো রবিনের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *