একটি বেদে শিশুর মা আরেকটি শিশু - হাতেখড়ি

একটি বেদে শিশুর মা আরেকটি শিশু

অরণ্য সৌরভ:

মোরা এক ঘাটেতে রান্দি বাড়ি আরেক ঘাটে খাই
মোদের সুখের সীমা নাই,
পথে ঘাটে ঘুরে মোরা সাপ খেলা দেখাই
মোদের ঘর বাড়ি নাই।
বলছি বেদে সম্প্রদায়ের কথা। বেদে সম্প্রদায়ের শিশুরা ভাসমান। ভেসে বেড়ায় নদী-বন্দরে, গ্রামগঞ্জে, শহর-নগরে। বেদে বহরের চারপাশে দুরন্তপনা, সাপ খেলা, বানর খেলা, কানামাছি, কুতকুত ও এক্কাদোক্কায় মেতে থাকে সারাবেলা। বাবা-মার সাথে বেরিয়ে পড়ে গাঁ ঘুরতে। হাটে-বাজারে সাপ, বাদর খেলায় বাবা-মাকে করে সহযোগীতা।

মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে সাপ, বাদর খেলার মতো ভয়ংকর পেশায় জড়িয়ে পড়ছে এসব শিশুরা। বেড়ে উঠছে অশিক্ষা কুশিক্ষায়। শিক্ষা বলতে জানে সাপ ও বাদর খেলা শেখা। দেশ উন্নত হলেও বেদে বহরে আজো পৌঁছায়নি শিক্ষার আলো। পরিচয় হয়নি অক্ষর-জ্ঞানের সাথেও। ফলে এরা নিরক্ষরই থেকে যাচ্ছে বংশ পরম্পরায়। যাযাবর জীবনে একেক স্থানে একেক সময় অবস্থান করায় সুযোগ নেই শিক্ষা গ্রহণের। শিক্ষা গ্রহণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ওরা।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে বেদের সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ। তবে আধুনিক জীবনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে কমছে বেদের সংখ্যা।

আড়াইহাজারের গোপালদী এলাকায় হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর পাড়ে বেদের বহর এসেছে সপ্তাহ খানেক আগে। বহরে ৪৩ জন নারী-পুরুষ রয়েছে। তাদের সাথে অবস্থান করছে ২৩ জন শিশু। এই শিশুরা শিক্ষার সুযোগের আবেদন জানিয়ে এ প্রতিবেদককের সাথে তাদের দুর্বিসহ জীবন কাহিনী তুলে ধরে।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার ও জাতীয় শিশু সনদ নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক শিশুই রাষ্ট্র কর্তৃক লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। দুর্ভাগ্য, এটি কার্যকর না থাকায় বেদে শিশুদের মতো দেশের অসংখ্য শিশু শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

জন্ম নিবন্ধন নেই বেদে পল্লীর অধিকাংশ শিশুর। এসব শিশুরা পায় না সরকারি কোনো সহযোগিতা। অবস্থানরত পল্লীর কাছাকাছি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থাকলেও স্কুলের বারান্দায় ওরা যায় না। সারাক্ষণ দূরন্তপনায় দিন কাটায় তাবুর আশেপাশে। শুধু শিক্ষা বঞ্চিতই হচ্ছে না বেদে শিশুরা, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতেও রয়েছেন। নোংরা পরিবেশে শিশুগুলো বেড়ে উঠছে। নেই সেনিটেশন ব্যবস্থা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জন্মের পর টিকা দেয়নি কোনো শিশুই। স্বাস্থ্য সেবায় ডাক্তারের প্রয়োজন হয় না তাদের। বাল্যবিবাহ বেদে জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মেয়েদের খুব অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়ার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকেতে রয়েছে তারা। একটি শিশুর মাও যেন আরেকটি শিশু।

স্কুলে যাওয়ার কথা জানতে চাইলে আপন, শান্ত, তানজিনা, তুফান ও আজিরুনা নামের কিছু শিশু জানায়, বাবা মায়ের জায়গা জমি নেই। নেই টাকা পয়সা এই কারণে বাবা মা পড়াশুনা করাতে পারে না। পেশাগত কারণে অনেক সময় বাবা-মা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এখন থেকে সব কিছু শিখতে হবে তাদের নইলে বড় হয়ে কি করে খাবে।

সমাজ বিচ্ছিন্ন এ সব শিশুরা নোংরা পরিবেশে সমাজের বোঝা হিসেবে বেড়ে উঠছে। এই উপলব্ধি কেবল সুশীল সমাজের নয়, খোদ বেদে পরিবারগুলোও বোঝে তাদের শিশুদের করুন ভবিষ্যৎ পরিণতি। তবুও অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখতে পারে না বেদে পরিবারের প্রতিটি শিশু।

এ ব্যাপারে বেদেনি সাহিদা জানান, ‘আমরা পেটের তাগিদে জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াই। সাপ বানর খেলা, শিঙ্গা লাগিয়ে, তাবিজ-কবচ বেঁচে যা পাই তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে। আধুনিক যুগের এই সময়ে মানুষ আর আমাদের খেলা, শিঙ্গা লাগানো, তাবিজ-কবচ নিতে চায় না। বাপ-দাদার পেশা কোনরকম আঁকড়ে ধরে আছি। অভাবের সংসারে সন্তানের পড়ালেখার কথা ভাবাও পাপ।

বেদে মন্টু জানান, বাড়িতে রেখে এসে বাল-বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখানো, তাদের দেখাশোনা করা আর লেখাপড়ার খরচ যোগানোর মতো অবস্থা আমাদের নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করি। সরকার যদি বিশেষ ব্যবস্থা নেয় তাহলে শিক্ষা আমাদের কপালে জুটবে।

সরকারি সফর আলী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আলী হোসেন বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের মত যাযাবররাও দেশের নাগরিক। শিক্ষাগ্রহণ একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যা বেদে শিশুদের রয়েছে। এই শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ আলী আজগর বলেন, সরকার দলিত হরিজন ও হিজড়া সম্প্রদায়কে প্রাথমিকভাবে উপবৃত্তি ও বয়স্কভাতার আওতায় এনেছে। সরকারের পরিকল্পনা আছে। পর্যায়ক্রমে বেদেদের উপবৃত্তি ও বয়স্কভাতার আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *